উদ্যোক্তা হতে চান?

উদ্যোক্তা হতে চান?

উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ইটুকে) আওতায় সারা দেশে দুই হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। খোঁজ জানাচ্ছেন এম ফরহাদ

দেশে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ-তরুণী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে বের হচ্ছে চাকরির সন্ধানে। মেধা ও যোগ্যতা থাকলেও এর বড় একটা অংশ ভালো চাকরি পাচ্ছে না। বেকার থেকে যাচ্ছে অনেকেই। চাকরির পেছনে না ছুটে মেধা ও সৃষ্টিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে এই বেকার যুবকরাই। আর এ কারণেই ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) হাতে নিয়েছে উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ইটুকে)। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার বিষয়েও সহযোগিতা করছে তারা।

হতে চাইলে উদ্যোক্তা
উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রোগ্রামের পরামর্শক ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. শফিকুর রহমান জানান, সৃষ্টিশীল বা কোনো বিষয়ে নতুনত্ব তৈরি করা উদ্যোক্তার প্রথম গুণ। সেটা হতে পারে তথ্যপ্রযুক্তির কোনো বিষয় বা অন্য কোনো কিছু, যাতে উদ্ভাবনী কাজের মাধ্যমে অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। তিনি আরো বলেন, ‘উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উচ্চশিক্ষিত হতে হবে, এমন নয়। বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই যে ভালো উদ্যোক্তা হবে আর অন্যরা সফল হতে পারবে না, এমনটা বলা যাবে না। তবে আমাদের প্রকল্পে যেহেতু কিছু শিক্ষণীয় বিষয় থাকে, সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি পাস হলে ভালো হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে বয়স হতে হবে ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে।’

প্রথমে নাম নিবন্ধন
২০১৩ সালে শুরু হওয়া ইটুকে প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ পেয়েছে ৮৬২ জন। এ প্রোগ্রামের আওতায় উদ্যোক্তা হতে চাইলে প্রথমেই নাম নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের সময় নাম-ঠিকানাসহ উদ্যোগের পরিকল্পনা লিখিত আকারে জমা দিতে হবে নতুন উদ্যোক্তাদের। আর যাঁরা ইতিমধ্যে কোনো প্রকল্প শুরু করেছেন, তাঁদের ব্যবসার নাম, ধরন, মালিকানার ধরন, যোগাযোগের ঠিকানা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করতে হবে নিবন্ধনের সময়। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে (www.business.org.bd) নাম নিবন্ধন করা যাবে। ডিসিসিআইয়ের প্রধান কার্যালয় : ৬৫/৬৬ মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১০০০ ঠিকানায় সরাসরি গিয়ে নিবন্ধন করা যাবে। তা ছাড়া আবেদনপত্র পাঠানো যাবে ডাকযোগেও। আগ্রহীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রাথমিক সব ধরনের সহায়তা করা হবে। প্রোগ্রামের হেল্প ডেস্ক থেকে জানা যাবে এ বিস্তারিত তথ্য।

মৌলিক প্রশিক্ষণ
উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেন বিষয়সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞরা। সব ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বিনা মূল্যে। বিষয়ভিত্তিক গ্রুপে ভাগ করা হয় নিবন্ধনকৃতদের। নতুন উদ্যোক্তাদের প্রথমে মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রকল্পের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগবে ও কিভাবে প্রকল্পের প্রোফাইল বা প্রোপোজাল তৈরি করতে হবে, ব্যাংক লোনের জন্য কোন কোন দিক তুলে ধরতে হবে এসব বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়। উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই মৌলিক প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য। দুই থেকে তিন দিনের এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ডিসিসিআইয়ের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ডিবিআইতে।

ব্যবসা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ
মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষে ব্যবসা দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। খাতওয়ারি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শেখানো হয় বিভিন্ন কৌশল। ব্যবসা পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, অর্থায়ন, সাংগঠনিক উন্নয়ন, পণ্যের উৎপাদন, দাম নির্ধারণ, উন্নয়ন ও বণ্টনসহ নানা বিষয় শেখানো হবে। এসব পাঠ দেওয়া হবে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ও অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে। প্রশিক্ষণের মেয়াদ নির্ভর করে বিষয়ের ওপর। নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিতে সংশ্লিষ্ট খাতের সফল উদ্যোক্তারা তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। ভালো উদ্যোক্তা হতে হলে কী কী গুণাবলি থাকতে হবে, সে বিষয়ও তুলে ধরা হয় প্রশিক্ষণে।

ঋণ দেবে ব্যাংক
বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রাম ডিপার্টমেন্টের নির্দেশনা অনুসারে উদ্যোক্তাদের ঋণ দেবে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এ প্রোগ্রামের আওতায় ঋণ নিতে চাইলে ইটুকে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রজেক্ট প্রোফাইল জমা দিতে হবে। প্রকল্পের কর্মকর্তারা প্রোফাইলের বিভিন্ন দিক ও সম্ভাব্যতা যাচাই করবেন। কাগজপত্র ও বিষয় ঠিক থাকলে কর্তৃপক্ষ ফাইল পাঠিয়ে দেবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে। স্থানীয় শাখার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে ঋণের ব্যবস্থা করবে ব্যাংক। ব্যাংক লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার প্রজেক্ট প্রোফাইল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বল্প সুদে ঋণ দেয় সব ধরনের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এসব খাতে উদ্যোক্তারা জামানতবিহীন সর্বোচ্চ ১০ লাখ এবং জামানতসহ সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।

উদ্যোগ হোক উদ্ভাবনীমূলক
যেকোনো বিষয়ে উদ্যোক্তা হয়ে ব্যবসা শুরু করতে পারেন। তবে সেটি হতে হবে উপযোগী ও সৃজনশীল। উদ্ভাবনীমূলক বা নতুনত্ব আছে কিংবা অন্যের থেকে একটু আলাদা উদ্যোগ হলে ভালো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে নতুন উদ্যোক্তারা নিচের খাতে অগ্রাধিকার পাবেন।
♦ ব্যবসাবান্ধব যেকোনো বিষয়ের নারী উদ্যোক্তা
♦ সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীমূলক কাজের নতুন ভাবনা
♦ তথ্য ও যোগ্যাযোগ প্রযুক্তি খাতের যেকোনো বিষয়
♦ কৃষি খাতের যেকোনো পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ
♦ শিল্প খাতের যেকোনো পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ
♦ আমদানিবিকল্প যেকোনো পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ
♦ রপ্তানিযোগ্য যেকোনো পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ
♦ শিক্ষাবিষয়ক যেকোনো উদ্যোগ, তা হতে পারে কারিগরি বৃত্তিমূলক ট্রেনিং সেন্টার বা সম্পর্কিত কোনো উদ্যোগ
♦ কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি মানের যেকোনো শিল্প

শুরুটা হোক নিজের মতো
প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মেধা ও বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে উদ্যোক্তাকে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। প্রাথমিক বিনিয়োগটা নিজে করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। ঋণের বেলায় প্রজেক্ট প্রোফাইল যাচাই-বাছাইয়ের সময় বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় নেন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা। যারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বা নিজের মূলধন দিয়ে শুরু করেছে, তাঁদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিকভাবে বড় আকারে না করে ছোট দিয়েই শুরু করা ভালো। পরিকল্পনা যদি ভালো হয়, তবে ক্ষুদ্র হলেও সম্ভাবনা অনেক। এখানেই শেষ নয় নতুন উদ্যোক্তাদের কেবল প্রকল্প শুরুর বেলায় নয়, পরবর্তী সময়ে কোনো সমস্যা হলে সেটিরও দেখভাল করে ইটুকে প্রকল্প। ঋণ পাওয়া, পণ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ অথবা এ ধরনের অনেক বিষয়ে সহযোগিতা দেয় তারা। প্রান্তিক পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত ছোট ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের একত্র করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের আরো দক্ষ করে গড়ে তোলার কাজও করছে ইটুকে।

Comments

comments

Comments are closed.