প্রচ্ছদ > ক্যারিয়ার > বাড়তি আয় > স্ট্রবেরি চাষে অনেক সম্ভাবনা
স্ট্রবেরি চাষে অনেক সম্ভাবনা

স্ট্রবেরি চাষে অনেক সম্ভাবনা

নামেই হাই ভ্যালু ক্রপ বা দামি ফল। তাই এটি কতটা সম্ভাবনাময় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের দেশেও এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে স্ট্রবেরি

 
স্ট্রবেরি বহুবর্ষজীবী বিরুৎ-জাতীয় উদ্ভিদ। স্ট্রবেরি গাছ মূল, কাণ্ড, মুকুট, পাতা, ধাবক, ফুল ও ফলে বিভাজিত। ফুল প্রজাতিভেদে একক কিংবা গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে থাকে। এর গাছের রং সবুজ এবং ফুলের রং সাদা। ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ হলেও পাকা ফল টুকটুকে গাঢ় লাল। স্ট্রবেরি গাছের গোড়া থেকে জন্ম নেয় এক ধরনের লতার মতো ধাবক বা রানার। সাধারণত স্বল্প দিবা প্রকৃতির জাতগুলোতে অধিক মাত্রায় রানার দেখা যায়। গোড়া থেকে গজানো লম্বা সরু ডাটার প্রান্তে প্রায় গোলাকৃতি আর খাঁজকাটা পাতা, রানার আর পার্শ্ব মুকুলের মিশেলে স্ট্রবেরি গাছের অবয়ব। গড়ে প্রতিটি স্ট্রবেরি গাছে ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ফল ধরে।

চারা তৈরি
স্ট্রবেরি চাষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ভালো জাতের চারাগাছ সংগ্রহ করা। ভালো জাতের চারা সংগ্রহ করতে বিশ্বস্ত কোনো নার্সারির সাহায্য নিতে হবে। কেউ চাইলে নিজেই চারা তৈরি করে স্ট্রবেরি চাষ করতে পারেন। এমনকি চারা বিক্রিও করতে পারেন। স্ট্রবেরি গাছ দেখতে অনেকটা থানকুনি অথবা আলু গাছের মতো, তবে পাতা আরো বড় এবং চওড়া। স্ট্রবেরি গাছের পাশ থেকে বের হওয়া রানারের গাঁট থেকে মাটির সংস্পর্শে শেকড় গজায়। পরিণত শেকড়যুক্ত গাঁট কেটে নিয়ে মাটিতে লাগালেই নতুন চারা তৈরি হবে। সমপরিমাণ মাটি ও গোবর সার মিশিয়ে পলিব্যাগে ভরে একটি করে শেকড়সহ গাঁটযুক্ত রানার পুঁতে দিতে হয়। একটি মাতৃগাছ থেকে ১৮ থেকে ২০টি চারা তৈরি সম্ভব।

স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী জায়গা
বন্যামুক্ত, ছায়ামুক্ত ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধা রয়েছে এমন জমি স্ট্রবেরি চাষের জন্য আদর্শ। সাধারণত বেলে দো-আঁশ মাটি এ ফল চাষের জন্য উপযুক্ত। স্ট্রবেরি চাষের আগে অবশ্যই মাটি পরীক্ষা করে নিতে হবে। নির্বাচিত জমির মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুসারে জৈব ও রাসায়নিক সার এবং প্রয়োজনে রোগ প্রতিরোধক বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। স্ট্রবেরি চাষের জন্য মাটির পিএইচ লেভেল অর্থাৎ মাটির অম্লতা বা ক্ষারতা হতে হবে ৬.০ থেকে ৭.০। জমির পিএইচ লেভেল কম হলে ডলোমাইট চুন প্রয়োগের মাধ্যমে মাটির পিএইচ লেভেল বাড়ানো যায়। যেহেতু স্ট্রবেরি শীতের দেশের ফল, তাই উঁচু মান ও উচ্চ ফলনের জন্য দিনের তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে ভালো হয়। দিনে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা সূর্যালোকের উপস্থিতি স্ট্রবেরির বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। দিনের দৈর্ঘ্য ১৪ ঘণ্টার কম হলে স্ট্রবেরি গাছে ফুল আসতে শুরু করে।

জমি তৈরি ও চারা রোপণ
স্ট্রবেরি চাষের জন্য জমি ভালোভাবে চাষ করে নিতে হবে। জমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অন্তত ৩০ সেন্টিমিটার গভীর করে চাষ দিতে হবে। যেহেতু স্ট্রবেরি গাছের শেকড় মাটির ওপর দিকে থাকে, সে জন্য মাটি ঝুরঝুরা করে নির্ধারিত মাত্রায় সার ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। স্ট্রবেরি চারা মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত রোপণ করা যায়। তবে নভেম্বর মাস স্ট্রবেরি চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। জমি তৈরির পর প্রতিটি লাইনের দূরত্ব হবে ৫০ সেন্টিমিটার এবং প্রতি সারিতে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে স্ট্রবেরি চারা লাগাতে হয়। বৃষ্টি হলে ক্ষেত থেকে অতিরিক্ত পানি সরিয়ে দিতে হবে, না হলে গাছ পচে যাবে।
এক বিঘা জমিতে চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফল তোলা পর্যন্ত খরচ হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা এবং ছয় মাসে আয় হয় প্রায় চার লাখ টাকা। এ ক্ষেত্রে এক বিঘা জমিতে প্রয়োজনীয় ছয় হাজার চারার মূল্য ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা এবং উৎপাদিত দেড় হাজার কেজি স্ট্রবেরির প্রতি কেজির মূল্য ধরা হয়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা।

সার প্রয়োগ ও অন্যান্য যত্ন
স্ট্রবেরির জন্য দরকার প্রচুর জৈব সার। এ জন্য প্রতি একরে ৫০ থেকে ৬০ কেজি ইউরিয়া সার, ৭০ কেজি টিএসপি সার এবং ৮০ কেজি এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। এসব সারকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে এক ভাগ দিতে হয় ফুল আসার একমাস আগে এবং অন্য ভাগ দিতে হয় ফুল ফোটার সময়। ফল ধরা শুরু হলে দুই-তিন দিন অন্তর জমিতে সেচ দিতে হবে। স্ট্রবেরি গাছে ফুল ধরাতে চাইলে বিশেষ যত্ন নিতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো জমি ঢেকে ফেলে। এতে ফলন ভালো হয় না। এসব লতা যাতে কম বের হয়, সে জন্য গাছের গোড়ায় খড় বা পলিথিন বিছিয়ে দিতে হবে। পলিথিন শিট ৩০ সেন্টিমিটার পর পর গোলাকার ছিদ্র করে স্ট্রবেরি গাছের ঝোপকে মুঠো করে ঢুকিয়ে দিতে হবে। বেশি ফলন ও তাড়াতাড়ি ফল পেতে গাছের পাতায় হরমোন স্প্রে করা যেতে পারে। জমিতে পটাশ সার ব্যবহার করলে সুমষ্টি স্ট্রবেরি ফল পাওয়া যাবে।

ফল সংগ্রহ ও বিক্রি
সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারি মাসে স্ট্রবেরি ফল পাকতে শুরু করে। পুরো পাকলে ফল লাল হয়ে যায়। তবে বিক্রির জন্য ফল পুরো লাল হওয়ার দরকার নেই। সে ক্ষেত্রে ফলগুলো শক্ত থাকা অবস্থায় তুলতে হবে। আর ফল তুলতে হবে বোঁটাসমেত। পরে কাগজের প্যাকেটে করে বাজারজাত করতে হবে। পাকা স্ট্রবেরি ফল ৭-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন এবং ডিপ ফ্রিজে বহুদিন সংরক্ষণ করা যায়।

 

সাক্ষাৎকার
নতুন একটি মিষ্টি স্ট্রবেরি জাত তৈরির গবেষণা করছি
ড. এম মনজুর হোসেন
অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৯৬ সালে জাপান থেকে পিএইচডি করে ফেরার সময় কিছু চারা নিয়ে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে ১২ বছর গবেষণার পর ২০০৭ সালে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে আমাদের দেশে ফলনশীল চারা তৈরিতে সক্ষম হই। বর্তমানে আমাদের ল্যাব থেকে উদ্ভাবিত তিনটি উচ্চ ফলনশীল জাত রাবি-১, রাবি-২ ও রাবি-৩ সারা দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। বর্তমানে নতুন একটি মিষ্টি স্ট্রবেরি জাত তৈরির গবেষণা চলছে। স্ট্রবেরি সারা বিশ্বে দামি ফল হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশের উদ্যমী যুবকরা যদি স্ট্রবেরি চাষে এগিয়ে আসে তবে দেশের অভ্যন্তরীণ পুষ্টির চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও স্ট্রবেরি রপ্তানি করা সম্ভব।

প্রথম বছর তেমন লাভ না হলেও মূলধন উঠে এসেছিল
নজরুল ইসলাম শিশির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্যারাডাইস এগ্রোগ্রিন স্ট্রবেরি প্রজেক্ট

২০০৯ সালে আমি স্ট্রবেরি চাষ শুরু করি। প্রথম বছর এক বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেছিলাম। মূলধন ছিল আড়াই লাখ টাকা। প্রথম বছর তেমন লাভ না হলেও মূলধন উঠে এসেছিল। তবে এ বছর আমার খামারে বাম্পার ফলন হয়েছে। প্রথম বছর আমি রাবি-৩ জাতের স্ট্রবেরি চাষ করলেও দুই বছর ধরে চঝচ-১ নামে একটি নতুন জাতের স্ট্রবেরি চাষ করছি। এ জাতটির পাঁচটি চারা আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আমার বন্ধু পাঠিয়েছিল। গড়ে প্রতিটি গাছে ৩২০ গ্রাম স্ট্রবেরি ফলে এবং ফল পাকার পরও বেশ কয়েক দিন তাজা থাকে।

 

Comments

comments

Comments are closed.