বৈধ পথে বিদেশে চাকরি

বৈধ পথে বিদেশে চাকরি

প্রতি বছর কাজের সন্ধানে বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমান লাখ লাখ শ্রমিক। সংখ্যাটি বড়ই বলা যায়, তবে প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে হয়তো এরচেয়েও বেশি লোক। একটু সচেতন হলে আর সঠিক পন্থা অবলম্বন করলে প্রতারণা এড়ানো যায়। কীভাবে? পরামর্শ দিচ্ছেন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ইমিগ্রেশন বিভাগের পরিচালক সেলিম রেজা, বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার আঞ্চলিক প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তাহনীম আফরোজ

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চাকরির জন্য কয়েকভাবে শ্রমিক যায়। এর মধ্যে অন্যতম রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাওয়া। আবার অনেক এজেন্সি দেশে আসার সময় ভিসা নিয়ে আসেন। তাঁরা বেশি টাকার বিনিময়ে লোক নিয়ে যান। এ ক্ষেত্রে প্রতারণাটা হয় বেশি। বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়া বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারিত হলে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কিছুই করার থাকে না।
শ্রমিকদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বাংলাদেশ বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ইত্যাদি। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জব কন্ট্রাক্ট, ভিসা, বহির্গমন ছাড়পত্র ইত্যাদি যাচাই করে নিতে পারেন। সহযোগিতাও চাইতে পারেন।

জব কন্ট্রাক্ট
কম্পানির সঙ্গে চাকরির শর্তাবলি-সংক্রান্ত যে চুক্তি হয়, তাকে জব কন্ট্রাক্ট বলে। চুক্তির শর্তাবলিতে বেতন, ভাতা, খাবার, বাসস্থান, ছুটি (সাপ্তাহিক এবং বার্ষিক), ওভারটাইম মজুরি, চিকিত্সা এবং কম্পানির দেওয়া অন্যান্য সুবিধা উল্লেখ থাকে। চুক্তিপত্রের সব শর্ত ভালোভাবে জেনে এবং তা গ্রহণযোগ্য মনে হলেই ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা উচিত। অনেক সময় দালালচক্র চাকরির ভুয়া চুক্তি দেখিয়ে টাকা নিয়ে নেয়। এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে কাগজপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি সংরক্ষণ করতে হবে।

ওয়ার্ক পারমিট
কোনো দেশের সরকার শ্রমিককে নির্দষ্টি সময় পর্যন্ত কাজ করার অনুমতি দিয়ে থাকে। ওই অনুমতিপত্রকে বলা হয় ওয়ার্ক পারমিট। এটা সংশ্লিষ্ট দেশের লেবার ডিপার্টমেন্ট থেকে ভিসার সঙ্গেই দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে কোনো ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয় না। শুধু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে শ্রমিকদের ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের সময় এক বছরের ওয়ার্ক পারমিট উল্লেখ করা হয়।
বৈধ ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করতে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে-
যে এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাচ্ছেন, তা বৈধ কি না যাচাই করুন। এ জন্য বিএমইটি অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করুন অথবা www.bmet.org.bd/ BMET/raHomeAction- এই ওয়েবঠিকানায় এজেন্সির নাম বৈধ তালিকায় আছে কি না তা দেখে নিতে পারেন। ওয়ার্ক পারমিটের ভিত্তিতে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সহযোগিতায় বিএমইটির ছাড়পত্র জোগাড় করুন। সে ক্ষেত্রে কোনো প্রতারণার শিকার হলে বিএমইটি সাহায্য করবে।

ভিসা
ভিসা যাচাইয়ের জন্য বিএমইটিতে যোগাযোগ করতে পারেন। ভিসা ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় হয়ে থাকলে ভিসা যাচাইয়ের জন্য অনুবাদকের সাহায্য নিতে পারেন।

বিএমইটির ডাটাবেজে নাম অর্ন্তভুক্তি
বিদেশযাত্রীকে অবশ্যই বিএমইটির ডাটাবেজে নাম নিবন্ধন করাতে হবে। এ জন্য এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। ডাটাবেজে নাম অর্ন্তভুক্ত হওয়ার পর বিএমইটি থেকে ছবি ও সিরিয়াল নম্বরসহ আইডি কার্ড দেওয়া হবে। এ জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্রের সঙ্গে, দুই কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, নাগরিক সনদপত্র, ৮০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার, অন্যান্য সনদপত্রের (যদি থাকে) সত্যায়িত কপি (শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ইত্যাদি) জমা দিতে হবে।

ব্যক্তিগত বহির্গমন ছাড়পত্র
স্বউদ্যোগে বা আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে ওয়ার্ক পারমিট/এনওসি/অ্যান্ট্রি পারমিট সংগ্রহ করলে ব্যক্তিগতভাবে বিএমইটিতে উপস্থিত হয়ে বা রিক্রুটিং এজেন্টের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছাড়পত্রের আবেদন করতে হবে।
ছাড়পত্রের জন্য নিম্নোক্ত কাগজপত্র জমা দিতে হবে-
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস থেকে নিবন্ধনকৃত কার্ড।
ভিসার পৃষ্ঠাসহ পাসপোর্টের প্রথম ছয় পৃষ্ঠার ফটোকপি।
ভিসা পৃষ্ঠার ইংরেজি অনুবাদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
মূল ভিসা অ্যাডভাইস/এন্ট্রি পারমিট/ওয়ার্ক পারমিট/এনওসির ফটোকপি।
১৫০ টাকা মূল্যমানের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চাকরি ও ভিসার যথার্থতা সম্পর্কে ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা।
পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নন-এই মর্মে গেজেটেড অফিসারের প্রত্যয়নপত্র।
সরকারি/আধা-সরকারি/স্বায়ত্তশাসিত/রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের সংশ্লিষ্ট নিয়োগকর্তা থেকে রিলিজ অর্ডার বা প্রেষণপত্র।
একক ভিসায় বিদেশগামী মহিলার ক্ষেত্রে আইনানুগ অভিভাবক থেকে ১৫০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অনাপত্তিপত্র।
ছাড়পত্রের ফি বাবদ ৬৫০ থেকে ১৫০০ টাকা জমা দিতে হবে।

বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে
আগে থেকে আপনার গন্তব্যস্থান ও বিমানের সময়সূচি ভালো করে জেনে নিন। সম্ভব হলে কয়েক দিন আগেই প্রয়োজনীয় জিনিসের চেকলিস্ট তৈরি করুন। কারণ, বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় যেকোনো একটি কাগজের জন্যই আপনার বিদেশ যাওয়া বাতিল হতে পরে। চেকলিস্টে যেসব কাগজ রাখবেন-
ভিসা সিলসহ পাসপোর্ট।
প্লেনের টিকিট।
পূরণকৃত এমবারকেশন কার্ড।
মেডিক্যাল পরীক্ষার সনদ।
বিএমইটির বহির্গমন সনদ।
বিএমইটির বহির্গমন ছাড়পত্র।
জব কন্ট্রাক্ট ও ওয়ার্ক পারমিট।
বিএমইটির প্রাক-গমন প্রশিক্ষণ কোর্সের বুকলেট।
চাকরিদাতার ঠিকানা।
দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ঠিকানা।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও ব্যাংক-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র।
প্রয়োজনীয় পরিমাণ টাকা। বৈধভাবে একজন বাংলাদেশি তিন হাজার মার্কিন ডলার সঙ্গে নিতে পারবেন। এটা পাসপোর্টের মাধ্যমে হতে হবে। এর বেশি নিতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি লাগবে।

এয়ারলাইনস কাউন্টার চেক ইন
সিকিউরিটি ও কাস্টম চেকিংয়ের পর যে এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাচ্ছেন, সেই কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ান। এখানে পাসপোর্ট, ভিসা ও টিকিট কর্তব্যরত অফিসার দেখবেন। এখানে আপনাকে বোর্ডিং কার্ড দেওয়া হবে। এ কার্ডে সিট নম্বর লেখা থাকবে। সঙ্গে পূরণকৃত বা খালি এমবারকেশন কার্ড না থাকলে চেক ইন কাউন্টার থেকে নিয়ে তা পূরণ করতে হবে।

জনশক্তি বু্যরোর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক
সিকিউরিটি ও কাস্টমস চেকিংয়ের পর বিমানবন্দরে অবস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক রয়েছে। এখানে অভিবাসীর বহির্গমন ছাড়পত্র সঠিক কি না তা যাচাই করা হয়। এরপর ইমিগ্রেশন ডেস্কে যেতে হবে।

ইমিগ্রেশন
ইমিগ্রেশন ডেস্কে অভিবাসীকে এমবারকেশন কার্ড, পাসপোর্ট ও ভিসা জমা দিতে হয়। এখানে ইমিগ্রেশন অফিসার অভিবাসীকে প্রশ্ন করতে পারেন। সব কিছু ঠিক থাকলে ইমিগ্রেশন অফিসার পাসপোর্টে ভ্রমণের দিন ও সময়সহ বহির্গমন সিল দেবেন, যা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি বোঝায়। ইমিগ্রেশন হয়ে গেলে যে বিমানে যাবেন, তাঁর জন্য ঠিক করা রুমে অপেক্ষা করতে হবে। বিমান ছাড়ার সময় হলে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হবে।

আরো লক্ষণীয় কিছু জরুরি বিষয়
আপনি বাইরে কাজ করার জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ কি না তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যে কাজ করতে যাচ্ছেন, তাতে আপনার দক্ষতা আছে কি না সে সম্পর্কে সচেতন হোন।
যে দেশে যাচ্ছেন, তার আইন সম্পর্কে আগেই জেনে নিন।
টাকা-পয়সা লেনদেনের সময় রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স ও ফোন নম্বর সংবলিত রসিদ সংগ্রহ করুন। সম্ভব হলে লেনদেনের সময় একজন সাক্ষী রাখবেন।
দেশের যেকোনো ব্যাংকে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলে তার কাগজ সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
বিদেশে অবস্থানকালে সব সময় আপনার পরিচয়পত্রটি হাতের কাছে রাখুন।
আপনার অর্জিত অর্থ বৈধভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে পাঠান।

অভিযোগ জানাবেন কোথায়?
বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারিত হলে
www.ovijogbmet.org/bangla- এ ওয়েবসাইটে গিয়ে আপনার অভিযোগ জানাতে পারেন। এ ছাড়া বিদেশে লোক পাঠানো সম্পর্কিত বিএমইটির স্পেশাল কোর্টে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বিএমইটি সংশ্লিষ্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
বিশেষ পরামর্শ
কোনো ঝামেলায় পড়লে সে দেশের আইওএম অফিসের সাহায্য নিন
রাবাব ফাতিমা
আঞ্চলিক প্রতিনিধি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা

যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক বেশি আছে, সেসব দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে শ্রম কর্মকর্তা আছে। সমস্যায় পড়লে শ্রমিকরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। বিদেশে যাওয়ার আগে দূতাবাসের ঠিকানা ও ফোন নম্বর নিয়ে গেলে ভালো। অনেক দেশে অভিবাসী শ্রমিকরা, অভিবাসন বিষয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা বা মানবাধিকার সংস্থার কাছে পরামর্শ বা আইনি সাহায্য চাইতে পারেন। যদি তাঁরা প্রবাসে আটকা পড়ে যান এবং দেশে ফিরতে চান, তখন ওই দেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন। এ ছাড়া অভিবাসন-সংক্রান্ত যেকোনো অনিয়মের ব্যাপারে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে আন্তমন্ত্রণালয় ও আন্তদাপ্তরিক টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। যেকোনো অভিযোগ এখানেও জানাতে পারেন।

Comments

comments

Comments are closed.