প্রচ্ছদ > ক্যারিয়ার > চাকরি খোঁজার কৌশল > খণ্ডকালীন চাকরি : পড়াশোনা, সঙ্গে আয়
খণ্ডকালীন চাকরি : পড়াশোনা, সঙ্গে আয়

খণ্ডকালীন চাকরি : পড়াশোনা, সঙ্গে আয়

পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের দেশেও খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ রয়েছে। এখানে বেতনটা শুরুতে কম হলেও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতনও বাড়তে থাকে। তা ছাড়া পড়াশোনা শেষ করার পর ভালো বেতনের চাকরির জন্য বসে থাকতে হয় না। বিস্তারিত জানাচ্ছেন তাহনীম আফরোজ

বিভিন্ন বুটিক হাউস, কিছু রেস্টুরেন্ট, পার্লার ও চেইন শপগুলোতে খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ থাকে। নাগরদোলা, রঙ, আড়ং, কে ক্রাফট, প্রবর্তনা, দেশাল, আগোরা, নন্দন বাজার, পিজা হাট, পারসোনা-এসব প্রতিষ্ঠানে বিক্রেতা অথবা কাস্টমার সার্ভিসে পার্টটাইম বা চুক্তিভিত্তিক কাজের সুযোগ আছে। মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলাসহ এ ধরনের বিভিন্ন আয়োজনেও থাকে খন্ডকালীন কাজের সুযোগ। এসব প্রতিষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদেরই বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়।

কাজের ধরন
চেইন শপিংমলগুলোতে সাধারণত পার্টটাইম কাজের সুযোগ বেশি থাকে। আর ফ্যাশন হাউসগুলোতে ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবের আগে এক বা দুই মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক লোক নেওয়া হয়। তবে মেয়েদের পার্টটাইম কাজের জন্য নিয়োগপ্রার্থীদের প্রথম পছন্দ আড়ং। এ ছাড়া পারসোনা, ওমেন্স ওয়ার্ল্ড, হেরোবিক্স ব্রাইডালের মতো পার্লারে মেয়েদের শিফটিং কাজের সুযোগ থাকে।

কতক্ষণ কাজ করতে হয়
‘সাধারণত চেইন শপগুলো সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সে ক্ষেত্রে ডিউটি টাইম হয় ছয়-সাত ঘণ্টা। আবার আড়ংয়ে পার্টটাইমের ক্ষেত্রে সময় সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা, আবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা। চাইলে কেউ এসব জায়গায় ফুলটাইমও কাজ করতে পারেন।’ বলছিলেন আড়ংয়ের সেলস এক্সিকিউটিভ রুমকি সুলতানা। পারসোনার অফিস এক্সিকিউটিভ নাজনীন সুলতানা প্রীতি জানান, ‘আমাদের এখানে দুই শিফটে কাজ হয়। প্রথম শিফট সকাল ১০টা থেকে ৪টা আর দ্বিতীয় শিফট দুপুর ১টা থেকে রাত ৮টা। কাজ শেষে যাতায়াতের জন্য কম্পানি থেকে আমাদের গাড়ির ব্যবস্থাও আছে।’

শিক্ষাগত যোগ্যতা
এসব পদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস হতে হয়। এর পর স্নাতক করছে এমন শিক্ষার্থীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়, বলছিলেন ফ্লেয়ার বিউটি সেলুনের এক্সিকিউটিভ শারমীন শহিদ। আগোরায় বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে দেখা গেল কাজ করতে। আগোরার সেলস এক্সিকিউটিভ জাহিদুল ইসলাম জানান, ‘সকালে ক্লাস করে বিকেলের শিফটে কাজ করি। মাসে বেতন যা পাই, তাতে বেশ ভালোভাবেই নিজের খরচ চলে যায়।’

অন্যান্য যোগ্যতা
এসব ক্ষেত্রে কাজের একটা মূল বিষয় হলো তথ্য দেওয়া। যেমন, কাস্টমার যখন কিছু কিনতে আসেন তখন তাঁকে সঠিক তথ্য জানানোই হলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই এসব ক্ষেত্রে ধৈর্য ও উপস্থিত বুদ্ধি সবচেয়ে জরুরি। এ ছাড়া বিক্রেতা যদি চৌকস হয়, তার জন্য কাজের ক্ষেত্রটা সহজ হয়ে যায়। কম্পিউটার জ্ঞানকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়। অনেক বিক্রয় কেন্দ্রে আবার ইংরেজিতে দক্ষতাও চাওয়া হয়।
নিত্য উপহারের প্রধান নির্বাহী বাহার রহমান জানান, একজন বিক্রেতার প্রধান দায়িত্ব হলো পণ্যের গুণাগুণ সঠিকভাবে ক্রেতার কাছে তুলে ধরা। তাই কাজ শুরুর আগে পণ্য এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হবে। এ ছাড়াও সময়জ্ঞান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীর একাগ্রতার প্রকাশ পায়।

নিয়োগ প্রক্রিয়া
আড়ংসহ বিভিন্ন চেইন শপে প্রয়োজন অনুযায়ী পত্রিকা বা ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তবে বেশিরভাগ ফ্যাশন হাউসগুলোর জন্য তেমন একটা বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না। সে ক্ষেত্রে ফ্যাশন হাউসের বিভিন্ন শোরুমে অথবা তাদের প্রধান কার্যালয়ে সিভি দিয়ে রাখলে, প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

নিয়োগকর্তার চাহিদা
উপস্থাপনা সুন্দর, ভালো করে কথা বলতে পারা এবং মার্জিত প্রার্থীকেই আমরা বাছাই করে থাকি-বলছিলেন তহুস ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী তৌহিদা তাহু। তিনি আরো বলেন, ‘প্রার্থীর মধ্যে অবশ্যই আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে এবং যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্থির হতে হবে। কারণ একটা প্রতিষ্ঠানের বাইরের রূপ হিসেবে কাজ করে তারা। তাদের আচার-ব্যবহার এবং সেবা দেখেই ক্রেতা বা ক্লায়েন্টদের মনে আমাদের স্থান হয়। তাই এক অর্থে তারাই প্রতিষ্ঠানের অবয়ব।’

পরবর্তী সম্ভাবনা
অনেকে এইচএসসির পর কাজ শুরুর পর স্নাতক শেষ হওয়ার পর চাকরি পেয়ে যান। আবার এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বিভিন্ন চেইন শপগুলোতে দীর্ঘদিন কাজ করার পর অনার্স শেষে সেই শপেই ফ্লোর ইনচার্জ অথবা ম্যানেজার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। যেমনটা ঘটেছে মীনা বাজারের ফ্লোর ইনচার্জ শামিম শাহেদের ক্ষেত্রে। তিনি জানান, স্নাতক শেষ করার আগে আমি মীনা বাজারের সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দিই। স্নাতক পাসের পর পদোন্নতি পেয়ে এখন ক্যাশ সার্ভিসে কাজ করছি। বেতনও ভালো পাচ্ছি।

সন্মানী ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা
সাধারণত চেইন শপ, আড়ংসহ কিছু ফ্যাশন হাউসে একটা নির্দিষ্ট বেতন থাকে। এটা নির্ধারিত হতে পারে আলোচনার ভিত্তিতেও। বিভিন্ন উৎসবের আগে ফ্যাশন হাউসগুলো অতিরিক্ত চাপ সামলানোর জন্য এক-দুই মাস চুক্তিভিত্তিক কিছু লোক নেয়। তখন বেশিরভাগ সময়ে সম্মানী দেওয়া হয় ঘণ্টা হিসেবে অথবা দিন হিসেবে। নভীন’স বিউটি সেলুনের কর্ণধার আমিনা হক জানান, আমাদের এখানে কাস্টমার রিলেশন বিভাগে খণ্ডকালীন চাকরির সুযোগ আছে। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করে আমরা বেশ ছাড়ও দিই।
কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান যাতায়াতের জন্য গাড়ির সুবিধাও দিয়ে থাকে। এ সম্পর্কে বলছিলেন, পারসোনার অফিস এক্সিকিউটিভ নাজনীন সুলতানা প্রীতি, ‘আমাদের এখানে কাজ শেষে যাতায়াতের জন্য কম্পানি থেকে গাড়ির ব্যবস্থা আছে।’

কিভাবে দেবেন সিভি
এসব জায়গায় সিভিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করলে ভালো হয়। যেমন-আপনার উচ্চতা, কাজের অভিজ্ঞতা যদি থাকে, কম্পিউটারে দক্ষতা এবং আপনার ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণক্ষমতা। আপনি যে স্থানে কাজ করতে চান, তাদের শোরুম অথবা অফিসের ঠিকানায় এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবিসহ সিভি জমা দিয়ে রাখতে পারেন। খামের ওপর অবশ্যই লিখবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত পদের নাম।

বিশেষ পরামর্শ
সুন্দর করে কথা বলা বাড়তি যোগ্যতা
খলিদ মাহমুদ খান
পরিচালক, কে ক্রাফট

প্রার্থী নিয়োগের আগে সবার প্রথমে দেখি সে প্রেজেনটেবল কি না। তারপর তার মার্জিত ভঙ্গি। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতাও একটা বড় বিষয়। আর এই পেশায় আমি মনে করি সুন্দর করে কথা বলতে পারাটা একটা প্লাস পয়েন্ট। কোনো উৎসবের আগে আমাদের অতিরিক্ত লোক নেওয়া হয় এবং তাদের সন্মানী দৈনিক কাজের হিসেবে দেওয়া হয়। আসলে এই ক্ষেত্রে ধৈর্য রাখলে অনেক সম্ভাবনাই থাকে। আমার এখানে একজন প্রার্থী পরপর তিন বছর এক মাস করে চুক্তিভিত্তিক কাজ করেছিল। তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার গ্রাজুয়েশন শেষে তাকে আমাদের এখানে স্থায়ী করে নেওয়া হয়। তাই আমি মনে করি, এটা অনেকটা ভবিষ্যৎ কাজের প্লাটফরম হিসেবে কাজ করে।

পড়ালেখার পাশাপাশি দেড় বছর কাজ করছি
ইসমত আরা জান্নাত ইভা
কাস্টমার রিলেশন অফিসার, হেরোবিক্স ব্রাইডাল বিউটি সেলুন

আমি ইডেনে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে এখানে আবেদন করেছিলাম। তারপর পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাই। পড়ালেখার পাশাপাশি প্রায় দেড় বছর এখানে কাজ করছি। কাজটা বেশ উপভোগ করছি। প্রতিদিন ৫ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়। সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকে এবং সেটা আমি আমার সুবিধামত সময়ে নিতে পারি। প্রতি ছয় মাস পর পর বেতন বাড়ানো হয়। আর দুই ঈদের বোনাস তো আছেই। পরীক্ষার জন্য আমি প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক সহযোগিতা পাই। যার কারণে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার অনেক দায়বদ্ধতাও আছে।

Comments

comments

Comments are closed.