প্রচ্ছদ > শিক্ষা > ফিচার > জাগো বাহে! কোনঠে সবায়…!
জাগো বাহে! কোনঠে সবায়…!

জাগো বাহে! কোনঠে সবায়…!

জান্নাত আরা সোহেলী :::

১.
১৭৮৩ সালে ব্রিটিশ বেনিয়া ওয়ারেন হেস্টিংস এবং তার খাজনা আদায়ের এদেশীয় দোসর দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে কৃষক বিদ্রোহের ডাক দিয়েছিলেন সাধারণ প্রান্তিক জন থেকে উঠে আসা নূরল উদ্দীন নামক একজন বীর কৃষক নেতা।

ওয়ারেন হেস্টিংস গং এর কু শাসনে দেশ তখন ছিয়াত্তের দুর্ভীক্ষপীড়িত মৃত্যুকূপ। কিন্তু এর মধ্য থেকে তিনি” হামার দ্যাশ, হামার অধিকার” বলে গঠন করেছিলেন প্রায় ৩৫০০০ কৃষক নিয়ে একটি বিপ্লবী গেরিলা বাহিনী। এদের চাওয়া পাওয়া ছিল অতি সামান্য। ক্ষমতা দখল নয়, তারা চেয়েছিল একটু আহার, একটু কাপড়, আর একটু বাঁচিয়ে রাখার নিশ্চয়তা।

কিন্তু সমরাস্ত্র সজ্জিত ব্রিটিশ বাহিনীর নিকট ১৭৮৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মোগলহাট নামক একটি স্থানে নূরল উদ্দীন এবং তার কৃষকবন্ধুদের অসহায় পরাজয় ঘটে। প্রচুর সম্ভাবনা নিয়ে এদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া নূরল কে চলে যেতে হয়। কিন্তু যাবার আগে তার শেষ কথা সে বলে যায় জাতিকেঃ

মাঠের মানুষ, দেশের মানুষ, হামার মানুষ হো…..ও!
রাস্তায় নামিলে পরে রাস্তা নাই ফিরিয়া যাবার।
বিভাগ না হও, বাহে, এক হয়া থাকো মোর পাশে।
মানুষ তৈয়ার কর মানুষ তৈয়ার।
যদি না পায়ের মাটি শক্ত করো, ধৈর্য ধরি করো আন্দোলন।
লাগে না লাগুক বাহে এক দুই তিন কিম্বা কয়েক জীবন?
হামার মরণ হয়, জীবনের মরণ যে নাই।
এক এ নূরলদীন যদি চলি যায়,
হাজার নূরুলদীন আসিবে বাংলায়।”

২.
১৯৫২ সালের ঠিক ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষার অধিকারে বুকের রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়ে এ জাতি নূরলদীনের সেই সম্ভাবনাকে সত্যে প্রমাণ করেছে।

৩.
১৯৭১ সালে এ জাতির ক্লান্তিলগ্নে আবারও ফিরে এসেছে নূরলদীন। স্বাধীনতার ডাক দিয়ে সমরাস্ত্র সজ্জিত পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দালালদের বিপরীতে গঠন করেছে আড়াই লক্ষের বেশি সংখ্যক গেরিলা নিয়ে মুক্তিফৌজ। এবার আর পরাজয় নয়। এই ডিসেম্বারেই স্বাধীনতার লাল সবুজে মুড়িয়ে দিয়েছে পুরো জাতিকে। সত্যি হয়েছে প্রায় দুশো বছর আগে দেখা এক দেশপ্রেমিক কৃষক নেতার স্বপ্ন। বস্তুত নূরলদীন বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। একে অপরের পরিপূরক।

৪.
এই ডিসেম্বারে জন্ম নেয়া আরেক দেশপ্রেমিক নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক ৭৫ পরবর্তী বিপন্ন দেশ ও অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে আবারো স্মরণ করেছিলেন ইতিহাসের এই বীর নায়কদের। অবরুদ্ধ বাক স্বাধীনতাকে মেনে নিয়ে ১৭৮৩ সালের নূরলদীনের কায়ায় নির্মাণ করলেন ১৯৭১ এর বঙ্গবন্ধুর ছায়া কে। রচিত হল নূরলদীনের সারাজীবন কাব্যনাটক। সমগ্র জাতির হয়ে কবি ঘোষণা করলেনঃ

” নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়।
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়
নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায়
যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়।

৫.
১৯৮৭ সালের নভেম্বারে সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে নিজেই দ্রোহের পোস্টার হয়ে গিয়েছিল সাধারণ এক বীর তরুণ নুর হোসেন। শাসকের বুলেট তার দেহ কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু ইতিহাস তাকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে।

৬.
ডিসেম্বারেই মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে আরেক নূরল হক। জ্ঞানে গুণে অবদানে এখন পর্যন্ত হয়ত সে কোনোভাবেই ইতিহাসের মহান নায়কদের সংগে তুলনীয় হতে পারে না। আর দেশও সেই অতীতের মতো অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেই। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে। স্বাধীন দেশে বিজয়ের মাসে তার কেবল ভিন্নমত অবলম্বনের জন্য মার খেয়ে হাসপাতালে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেমনটি কাম্য ছিল না আবরারের অকালপ্রয়াণ।

ছাত্রলীগ বলছে তারা দায়ী নয়। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কাজ। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কী এমন রাগ? কোটা বন্ধ হয়েছে তাই? যতদূর মনে পড়ে এই ছেলেগুলি কোটা সংষ্কারের কথা বলেছিল, কোটা বন্ধের কথা নয়। নূরু ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি। সে আইন অমান্য করলে, অপরাধ করলে দেশবিরোধী কথা বললে তার জন্য প্রশাসন রয়েছে, আইন রয়েছে আদালত রয়েছে। তুমি, তোমরা কে ভাই আইন নিজের হাতে তুলে নেবার?

ভেবে দেখো ভাইলোগ! নূরু অতি সাধারণ! কিন্তু প্রহারে প্রহারে তোমরাই তাকে দেশের কাছে দশের কাছে অসামান্য করে তুলছো! পলি মাটির এ দেশের মানুষের মন অনেক নরম। লাঠির থেকে চোখের পানির মূল্য ও আবেগ তাদের কাছে অনেক বেশি।৷

এভাবেই বেঁচে থাকে ভিন্নমথ! এভাবেই কবির কলমে, জনমনে, ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকে নূরলদীনঃ জাগো! বাহে কোনঠে সবায়?”

# ২৭ ডিসেম্বর প্রিয় নাট্যকার কবি সৈয়দ শামসুল হকের জন্মদিন। কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

জান্নাত আরা সোহেলী : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

.

Share and Enjoy !

0Shares
0 0 0

Comments

comments

Comments are closed.