প্রচ্ছদ > শিক্ষা > ভর্তি প্রস্ততি > বুয়েট ভর্তি প্রস্তুতি : সেরা শিক্ষার্থীর পরামর্শ
বুয়েট ভর্তি প্রস্তুতি : সেরা শিক্ষার্থীর পরামর্শ

বুয়েট ভর্তি প্রস্তুতি : সেরা শিক্ষার্থীর পরামর্শ

চট্টগ্রামের ছেলে অনিক। জীববিজ্ঞানে ভয় কাজ করলেও গণিতের প্রতি ঝোঁকটা বেশি ছিল। সেই থেকেই প্রকৌশলী হবার শখ। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিকে প্রবেশের পর থেকেই তার স্বপ্ন বুয়েটের রঙ্গিন আঙিনায় পদার্পণের। সেই লক্ষ্যে ছুটে চলা। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হবার পর নিয়মিত কলেজ লাইব্রেরি থেকে বিভিন্ন রেফারেন্স বই নিয়ে পড়াশুনা করত সে। লক্ষ্য একটাই নিজেকে যতটা সম্ভব ঝালিয়ে নেবার। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত তার সেই ঝালিয়ে নেওয়াটা থামে নি। সেই অনিকই ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান দখল করে নেয়।

কে না জানে উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকে ভর্তি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত সময়টা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেমন ছিল অনিকের এই সময়টা? কিংবা কীভাবে পড়াশুনা করে প্রস্তুত করেছেন তিনি নিজেকে? সেই আলোকে যারা ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী এই সময়টা তাদের কীভাবে কাজে লাগানো উচিত সে সম্বন্ধে পরামর্শ দিয়েছেন এ মেধাবী শিক্ষার্থী।

অনিক সরকার।।

সকলের প্রতি অনেক অনেক শুভেচ্ছা। আশা করি সকলেই ভাল আছ এবং সকলেই ভালভাবে সদ্যসমাপ্ত এইচ. এস. সি. পরীক্ষা শেষ করেছ। ছোটবেলা থেকেই অধিকাংশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীর স্বপ্ন থাকে প্রকৌশলী হবার আর সেই স্বপ্নের বহুল আকাঙ্ক্ষিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)। এই স্বপ্নকে টার্গেট করে তোমরা যারা তোমাদের ভর্তি প্রস্তুতি শুরু করেছ বা করবে বলে মনস্থির করেছ মূলত তাদের উদ্দেশ্যে আমার এই লেখা।

anik

কোন সন্দেহ নেই বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম বড় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। অন্যান্য ভর্তি পরীক্ষার সাথে এই ভর্তি পরীক্ষার সবথেকে বড় পার্থক্য হল – এক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীর সংখ্যা থাকে অনেক কিন্তু তার মধ্যে খুব ক্ষুদ্র একটা অংশই ভর্তি পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে পারে বা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল ফল করতে না পারলে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়া যায় না।

তাই সকলের প্রতি আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ থাকবে উচ্চমাধ্যমিকের ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত, বুয়েট ভর্তির প্রস্তুতির পাশাপাশি যতটা সম্ভব অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষারও কিছু বেসিক প্রস্তুতি গ্রহন করে রাখতে পার।

মনে রাখবে এই সময়টা কিন্তু অত্যন্ত স্বল্প। তাই যতটা সম্ভব সেই সময়কে তোমাদের সর্বোচ্চ কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেই হবে।

এবার আসি বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহন প্রসঙ্গে। আমি আজ কিছু সাধারণ কথা বলব। কোন নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিশেষভাবে পরবর্তীতে বলার চেষ্টা থাকবে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে (আমাদের সময়ে) অনুষ্ঠিত বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষা হবে মোট ৬০০ নম্বরের। মোট ৬০টি লিখিত প্রশ্ন থাকবে যেখানে প্রতিটি প্রশ্নের মূল্যমান থাকবে ১০ করে। গতবার আমাদের কোন নৈর্ব্যক্তিক ছিল না। আশা করা যায় এবারো থাকবে না। এই ৬০টি লিখিত প্রশ্নের মধ্যে ২০টি করে প্রশ্ন থাকবে গণিত, পদার্থ এবং রসায়ন থেকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর প্রশ্নের নিচেই করতে হয় এবং তার জন্য খুব সীমিত জায়গা বরাদ্দ থাকে। ফলে প্রশ্নের উত্তর যথাসম্ভব সংক্ষেপে করাই শ্রেয় এবং ভাষার বাহুল্য প্রয়োগ একেবারেই করা উচিৎ নয়।

এবার একটু বিষয়গুলোর দিকে আলোকপাত করি।

পদার্থবিজ্ঞান।।
পদার্থ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে গেলে বলতে হয়, বইয়ের প্রতিটি থিওরি এবং সূত্রের প্রমাণ মনোযোগ দিয়ে বুঝার চেষ্টা করবে। বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ রাখবে না। এখানে লজ্জা করে বা অবহেলা কোন বিষয় কনফিউশন রেখে গেলে সেক্ষেত্রে তোমারই ক্ষতি সবথেকে বেশি হবে। বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধানের ক্ষেত্রে আমি দেখেছি পদার্থে প্রায়শই এমন কিছু সমস্যা দিতে দেখা যায় যেখানে কিনা একই সাথে দুই তিনটি সূত্র প্রয়োগ করে নতুন একটি সূত্রের মাধ্যমে অংক করা লাগছে। তাই বিশেষভাবে আমি বলব সূত্র একবারে মুখস্থ না করে প্রতিটা সূত্রের স্টেপ বাই স্টেপ প্রমাণ বোঝার চেষ্টা কর।

এই স্টেপগুলার মধ্যেই কোন না কোন লাইনের মাধ্যমে দেখবা তোমার অংক হয়ে গিয়েছে। আর অবশ্যই প্রচুর পরিমানে প্রবলেম সমাধান করবে। তবে আমি বলব খুব কঠিন সমাধানগুলো নিয়ে বসে না থেকে বইতে যেই প্রবলেমগুলো আছে আগে সেগুলোই ভাল করে সমাধান কর এবং নিয়মিত চর্চা কর। আর যখনই যেই প্রবলেম করবে কনসেপ্ট পরিস্কার রেখে সমাধান করবে। আমার মতে যেই টপিকগুলোতে সব থেকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিৎ তা হল:
• ভেক্টর
• দ্বিমাত্রিক গতি
• মহাকর্ষ
• শব্দের বেগ
• পৃষ্ঠটান
• তুল্য রোধ (বিশেষত শর্ট সার্কিটসহ সমস্যা)
• তড়িৎ প্রবাহের চৌম্বক ক্রিয়া
• আলোর প্রতিসরণ এবং প্রিজম

গণিত।।
এবারে আসি গণিতের দিকে। আমার কাছে ভর্তি পরীক্ষায় এটা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিগত বছরগুলোর প্রশ্ন সমাধানের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি আমার কাছে মনে হয়েছে এই বিভাগেই সব থেকে বৈচিত্র্যময় এবং ভিন্নধর্মী (unpredictable) প্রশ্ন বেশি আসে। তাই এই বিষয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রচুর চর্চা করা উচিৎ।

তবে গণিতে পদার্থের মত থিওরির জন্য খুব বেশি সময় দেবার দরকার নেই (বেশিমাত্রায় প্রয়োজনীয়গুলো ছাড়া)। তবে হ্যা! কিছু থিওরির বেশ কিছু অ্যাপ্লিকেশন আছে। একই থিওরি ব্যবহার করে দেখবে বিভিন্ন লেখকের বইতে ৮-১০ টাইপের অংক আছে। তাই আমার মতে গণিতে অবশ্যই একটু বেশি সময় দিবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে নিচেরগুলো ভাল করে চর্চা করবে –
• INTEGRATION
• PROBABILITY
• LIMIT
• বিন্যাস – সমাবেশ (একাধিক case)
• জটিল সংখ্যার আর্গুমেন্ট
• স্থিতিবিদ্যা (বিশেষত লামীর উপপাদ্য এবং বল ত্রিভুজ সম্পর্কিত প্রবলেম)

রসায়নবিজ্ঞান।।
আর রসায়ন নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় এই সাবজেক্টটাকেই সকলে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব প্রদান করে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এই বিভাগেও কিন্তু সমান ২০টি প্রশ্ন রয়েছে। এবং ২০০ নম্বর। তাই এই বিষয়টির দিকেও কমবেশি নজর দিতে হবে। অস্বীকার করব না কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো বুঝতে যাবার থেকে মুখস্থ করা লাগে, তবে বারংবার প্র্যাকটিসের মধ্যে থেক। দেখবে জটিল বিষয়গুলিও আয়ত্তে চলে আসবে।

আরেকটি বিষয়, বিশেষ করে প্রতিটি বিক্রিয়ার মেকানিজম ভাল করে বুঝে পড়ার চেষ্টা করবে এবং আমার মতে আলাদা খাতায় গুছিয়ে লখে রাখা ভাল। আর জৈব রসায়নকে একটু বেশি গুরুত্ব দিও। প্রথম পত্রের প্রবলেম যেগুলো আছে ভাল করে চর্চা কর। গুরুত্বপূর্ণ টপিক বলতে
• হাইড্রোকার্বন
• অ্যালকোহল
• জারণ বিজারণ
• অম্ল ক্ষারক সাম্যাবস্থা এই গুলো খুব ভাল করে দেখবে।

সাধারণ কিছু টিপসঃ

  • শুরু থেকেই বিষয়গুলোর প্র্যাকটিস খাতা বাদেও সম্ভব হলে ভিন্ন খাতায় ব্যতিক্রমী অংকগুলো আলাদা করে তুলে রেখে বারবার চর্চা করার চেষ্টা কর।
  • কোন বিষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ রেখ না। সময় নিয়ে বুঝে একেবারে পড়ে ফেল যাতে পরবর্তীতে রিভিশনের সময় বাড়তি সময় দেয়া না লাগে।
  • প্রতিটি চ্যাপ্টার শেষে অবশ্যই প্রশ্নব্যাঙ্ক সমাধান করে ফেলবে।
  • মূল বইকে প্রাধান্য দিয়ে আগে শেষ কর। তারপর সহায়ক বই হিসেবে অন্যান্য বই গুলো দেখতে পার।
  • উচ্চমাধ্যমিকে করে আসা প্রবলেমগুলোই বারবার চর্চা করে আয়ত্তে এনে তারপর ভিন্নধর্মী অংকগুলোতে যেও। আগে ভিন্নধর্মী অংকগুলো করতে যেয়ে মূল অংকগুলো ভুলে যেও না।
  • আর যেই অঙ্কই কর না কেন সব লিখে বারবার প্র্যাকটিস কর। যে কোন এক লেখকের বই সম্পূর্ণ শেষ করে তারপর ভিন্ন লেখকের বই এর আনকমন অংকগুলি করবে।

তো আজ আপাতত এটুকুই থাকুক। তোমরা সবাই তোমাদের সর্বোচ্চ পরিশ্রমটুকু করবে সেই আশা রইল। স্রষ্টা তোমাদের সকলের ভাল করুন সেই শুভকামনা রইল। ভাল থেক।

সূত্র : ক্যাম্পাস টু ক্যারিয়ার টুয়েন্টিফোর

আরো দেখুন :

বুয়েট ভর্তি প্রস্তুতি : সেরা শিক্ষার্থীর পরামর্শ : পরামর্শ দিয়েছেন ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম নাফিস ইরতিজা তৃপ্ত

Comments

comments

Comments are closed.