প্রচ্ছদ > শিক্ষা > ফিচার > লক্ষ্য যখন নটর ডেম কলেজ ভর্তি
লক্ষ্য যখন নটর ডেম কলেজ ভর্তি

লক্ষ্য যখন নটর ডেম কলেজ ভর্তি

এসএসসিতে ভালো ফলাফল করার পর মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগেরই লক্ষ্য থাকে নটর ডেম কলেজে ভর্তি হওয়া। দেশের প্রায় সব কলেজে এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হলেও নটর ডেম কলেজে নেয়া হয় ভর্তি পরীক্ষা। আবেদন ফরমও সরাসরি সংগ্রহ করতে হয় কলেজ থেকে। কিভাবে ফরম সংগ্রহ করবে, ভর্তি প্রক্রিয়াই বা কেমন, পরীক্ষায় কি ধরনের প্রশ্ন আসে- এ নিয়ে অনেক শিক্ষার্থীরই সঠিক ধারণা থাকে না। তাদের জন্যই পরামর্শ দিয়েছেন নটর ডেম কলেজের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা ।

★ ভর্তি পরীক্ষা কারা দিতে পারবে?
– ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার আগে নির্ধারিত তারিখে ফরম তুলতে হবে। সেই ফরম পূরণ করে জমা দেয়ার পর জানা যাবে ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচী। ফরম জমা দেয়ার পর কলেজ থেকে একটি তালিকা প্রকাশ করা হবে। সেখানে যারা পরীক্ষা দিতে পারবে তাদের রোল নাম্বার দেয়া থাকবে।
২০১৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগে যাদের সব বিষয়ে এ+ ছিলো, তারাই ভর্তি পরীক্ষা দিতে পেরেছিল। ২০১৫ সালে একটু পরিবর্তন আসে। যাদের এসএসসির রেজাল্ট এ+ ছিল তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়েছিল এবং তারা চান্সও পেয়েছিল। বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে এবং ইংরেজিতে এ+ না পেলে তাদের পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়নি। বাংলা, সমাজ, ধর্ম- এই বিষয়গুলোতে যাদের এ+ আসেনি তারা পরীক্ষা দিতে পেরেছিল ২০১৫ তে। এবছরও বাংলা,সমাজ,ধর্ম- এই বিষয়গুলোতে যদি কারও এ+ না আসে তাহলে তারাও অবশ্যই ফর্ম তুলবে। কে জানে? পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেলে এবং ভালো করতে পারলে তুমিও হয়তো সুযোগ পেয়ে যেতে পারো।

★ ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম কবে দেয়া হয়? পরীক্ষা কবে হবে?
– নটর ডেম কলেজের ভর্তি পরীক্ষার ফরম কবে দেয়া হবে- সেটা এখনও কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়নি। প্রথমে ফরম ছাড়ার সময় জানানো হবে। তারপর ফরম তুলে জমা দেয়ার পর জানতে পারবে পরীক্ষার তারিখ এবং সময়। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন- ২৬ মে থেকে কলেজ ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে। অর্থাৎ ২৬ মে’র মধ্যেই কলেজ থেকে ফরম দেয়ার তারিখ জানা যাবে।

★ ভর্তি পরীক্ষার ফরম কি বাবা-মা তুলতে পারবেন?
– না। শিক্ষার্থী নিজে লাইনে দাঁড়িয়ে ফরম তুলতে হবে। কারণ ফরম হাতে পাবার পর সেদিনই পূরণ করে শিক্ষার্থীর নিজের স্বাক্ষরসহ জমা দিতে হবে। ফরমে একজন অভিভাবকের স্বাক্ষর লাগে। তাই তোমার নিজের উপস্থিতি এবং বাবা-মা যেকোন একজনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। ফরম পূরণের সময় বাবা-মা অথবা বড় কারও সাহায্য নিতে পারো। বন্ধুদের সাথে ফরম তুলে একসাথে জমা দিতে পারো। এতে পরীক্ষার হলে আশেপাশে পরিচিতদের পেয়ে পাবে। তবে পরীক্ষা হলে দেখাদেখি বা কথা বলার সুযোগ নেই।

★২য় দিন ফরম তুললে কোন সমস্যা হবে কি?
– ফরম তোলার জন্য দুই দিন সময় দেয়া হয়। প্রথম দিনে অনেক ভিড় হয় এবং ২য় দিনে ভিড় তাকে তুলনামূলক কম। অনেকেই প্রথম দিন খুব ভোরে লাইন ধরেন। যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসবেন তাদের জন্য ২য় দিনে ফরম তোলা সুবিধাজনক হবে। এতে ঢাকায় এসে থাকার জন্য আলাদা খরচ করতে হবে না। ২য় দিনে ফরম তুললে চান্স পাওয়া যাবে না – এই ধারনা একেবারেই ভুল। আবার সবার আগে ফরম তুললে চান্স নিশ্চিত এই ধারণা করে আগের দিন রাতে গেটের সামনে ঘুমানোও বোকামি হবে। তাই যারা ঢাকায় থাকো তারা প্রথম দিন খুব সকালেই চলে যাবে। আর যারা ঢাকার বাইরে থেকে আসবে তাদের জন্য ২য় দিনে ফরম সংগ্রহ করাটাই ভালো হবে।

★ পরীক্ষার ধরন কেমন হয়?
– ভর্তি পরীক্ষাটার দুটো অংশ- লিখিত এবং মৌখিক।
লিখিত পরীক্ষার সময় ৩০ মিনিট। ৩০ মিনিটের মধ্যে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তবে দেখাদেখির চেষ্টা না করাই ভালো। লিখিত পরীক্ষা শেষ হবার পরপরই মৌখিক পরীক্ষা হবে। লিখিত পরীক্ষা কয়েক শিফটে হয়। যেমন: ১০টা থেকে ১১ টা এক শিফট আবার ১১ টা থেকে ১২ টায় আরেক শিফটের পরীক্ষা হবে। এভাবে বেশ কয়েকটা শিফটে পরীক্ষা নেয়া হয় এবং প্রতি শিফটে প্রশ্ন আলাদা থাকে।

★ লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন কোথা থেকে আসে?
– ২০১২, ২০১৩, ২০১৪ সালে ইংরেজি গ্রামার থেকে ১০টি, ফিজিক্সে ৫টি, কেমিস্ট্রিতে ৫টি এমসিকিউ প্রশ্ন এসেছিল। ফিজিক্স-কেমিস্ট্রিতে কোন কঠিন অংক ছিলো না। গণিত অংশে ৪টি অংক দেয়া হয়। ২০১৫ সালে ইংরেজি গ্রামার ১০টি, ফিজিক্সে ৪টি, কেমিস্ট্রিতে ৪টি, বায়োলজি থেকে ২টি এমসিকিউ এসেছিল। আর গণিতে এসেছে ৪টি অংক। গণিতে কোনো সৃজনশীল প্রশ্ন করা হয় নি। ২০১৫ সালে কোন শিফটের প্রশ্নে ২টি সাধারণ জ্ঞান ছিল, আবার অনেক শিফটে কোনো সাধারণ জ্ঞান আসেনি।

★ পরীক্ষার প্রস্তুতি কিভাবে নিতে হবে?
– প্রতি বছরের প্রশ্ন বই থেকেই আসে। এসএসসি পরীক্ষার সময় তোমার যে পাঠ্যবই ছিল, সেখান থেকেই সকল প্রশ্ন এসেছে বিগত বছরগুলোতে। তাই বইয়ের বাইরে কঠিন বিষয় আয়ত্ত করার কোন প্রয়োজন নেই। নটর ডেম কলেজের গেটের সামনে যেসব ভর্তি গাইড দেয়া হয় সেগুলোরও কোন প্রয়োজন নেই।

গণিতের উপর জোর দিতে পারো। এসএসসি পরীক্ষার আগে গণিতের যেমন প্রস্তুতি নিয়েছিলে, এবারও তেমন করে প্রস্তুতি নিবে। সবচেয়ে ভাল প্রস্তুতি নিতে বইয়ের অংকগুলো দেখে যেতে পারো। পরীক্ষায় সবগুলো অংক পারার চেষ্টা করবে। ৪টি অংক পারার প্রতি জোর দিলেই ভাল ফলাফল আশা করতে পারো। সাধারণত ক্যালকুলেটর নিতে দেয়া হয় না। তবে, গতবছর পরীক্ষার সময় ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছিল। তাই এবারও ক্যালকুলেটর নিয়ে যেতে পারো।
অন্যান্য বিষয়, যেমন: ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি- পড়তে পারো। তবে গণিত বিভাগের অংকগুলো পারার উপর জোর দিতে হবে। এক রাতের প্রিপারেশন নিতে চাইলে- শুধুমাত্র এসএসসির সাধারণ গণিত এবং উচ্চতর গণিত বইয়ের অংকগুলোর সমাধান দেখে যেতে পারো। তবে কয়েকদিন প্রস্তুতি নেয়াটা ভালো।

★ মৌখিক পরীক্ষায় প্রশ্ন কেমন হয়?
– মৌখিক পরীক্ষায় খুব সাধারণ কিছু প্রশ্ন করা হয়। একটা প্রশ্ন সবাইকেই করা হবে – “তুমি এই কলেজে কেন পড়তে চাও?”।
উত্তরে সত্য কথাটাই বলবে। বলতে পারো – তোমার নিজের ইচ্ছা আছে এবং সেই সাথে বাবা-মা’র ইচ্ছা আছে। এই কলেজটিতে কোন প্রকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই এবং শিক্ষার মান অনেক ভাল বলে ইচ্ছাটা আরও বেশি। পরিবারে এই কলেজের কোন ছাত্র থাকলে তার নাম উল্লেখ করে দিতে পারো। এর বাইরে অনেক রকম প্রশ্নই করা হয়। অনেককে তেমন কোন প্রশ্ন করা হয় না। আবার অনেকের খুবই কঠিন কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তাই মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে পজিটিভ থাকার চেষ্টা করো।

★ কেমন ড্রেসআপে যেতে হবে? ফর্মাল ড্রেস কি আবশ্যক?
– ফর্মাল ড্রেসে যেতে চাইলে যেতে পারো। সেটা খুবই ভালো, কিন্তু আবশ্যক নয়। সাধারণভাবেও যেতে পারো। খুব সাধারণ বলতে শার্ট আর এক রঙের চার পকেটের প্যান্ট পড়তে পারো। তবে জিন্স না পড়াটাই ভাল। এমনও অনেকে আছে যারা পাঞ্জাবি পড়ে পরীক্ষা দিয়েও চান্স পেয়েছে। সহজ কথায়, ভদ্র এবং মার্জিতভাবে যেতে হবে। চুল,নখ ছোট রাখতে ভুলো না। পড়ার মত জুতা না থাকলে স্যান্ডেল পড়েও যেতে পারো। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়েও চান্স পেয়েছে এমন উদাহরণ অনেক আছে।
সত্যি কথা হল, স্মার্টনেস কাপড়ে থাকলেই হবে না ভেতরেও থাকতে হবে। শার্টের বুকের বোতাম লাগান না লাগানো নিয়ে অনেকের অনেক রকম প্রশ্ন থাকে। ভদ্রতা হল বুকের বোতাম লাগিয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারে পরামর্শ থাকবে- ব্যতিক্রম হবার চেষ্টা করো না, এটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অনেকে নিজেকে বেশি সহজ সরল সাজানোর জন্য কলারের বোতাম লাগিয়ে যায়। এটার তেমন প্রয়োজন নেই। কলারের বোতাম খুলে যাবে।

★ পরীক্ষা খাতায় লেখার কিছু টিপস
– ১। পরীক্ষার প্রশ্নেই উত্তর লিখতে হবে, কোন আলাদা খাতা বা রাফশিট দেয়া হবে না। ৩০ মিনিট সময়ে সব প্রশ্নের উত্তর করাটা কঠিন কাজ, তাই ঘড়ি নিয়ে যাবে। একটি পাতায় প্রশ্ন করা হয়। প্রথম পৃষ্ঠায় থাকবে সব প্রশ্ন আর দ্বিতীয় পৃষ্ঠা ফাঁকা থাকবে। প্রথম পৃষ্ঠায় প্রশ্নের পাশে ফাঁকাস্থানে উত্তর লিখতে হবে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইংরেজি-এর এমসিকিউ অংশের উত্তর এক শব্দে দেয়া যায়। তাই এই বিষয়গুলোর উত্তর করতে কোন সমস্যা হবে না। গণিত অংশের উত্তর করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারো।
২। গণিত অংশে বিগত বছরগুলোতে মোট ৪টি অংক দেয়া হয়েছে। প্রতি অংকের মাঝে দুই আঙ্গুলের মত ফাঁকা জায়গা পাবে। এতো ছোট জায়গায় কিভাবে উত্তর করতে হয় সেটা জানা খুব জরুরী। উপরে উল্লেখ করেছি, দ্বিতীয় পৃষ্ঠা খালি থাকে। এই খালি পৃষ্ঠাকে কাজে লাগাতে হবে। কারণ তোমাকে কোন রাফ কাগজ দেয়া হবে না। কৌশলটা হল- পেন্সিল আর স্কেল দিয়ে শুরুতেই সমান চারভাগ করে নিবে এই সাদা পৃষ্ঠা। এরপর এখানে ৪টি অংশে পেন্সিল দিয়ে চারটি অংক করবে। পেন্সিল দিয়ে অংকগুলো রাফ করবে, তারপর প্রথম পৃষ্ঠায় চলে যাবে। অংকটি খুব দ্রুত, ছোট করে এবং স্পষ্টভাবে সমাধান করে দিবে।
৩। পরীক্ষার শুরুতে অংক প্রশ্নগুলো দেখবে। যদি পারো অংকগুলো করে ফেলবে; না পারলে অন্য প্রশ্নগুলো উত্তর করবে। উত্তর করতে করতে অংকের সমাধান মাথায় কাজ করলে তো কেল্লাফতে। একটি অংক না পারলে সেটার পেছনে একদম সময় নষ্ট করবে না। পরের উত্তরগুলো করতে থাকবে। শেষে দেখবে তোমার সকল উত্তর করা শেষ তবে হাতে ৯-১০ মিনিট সময় আছে। তখন চিন্তা করে বাকি অংকের সমাধান করতে পারবে।
৪। উত্তরে যথাসম্ভব চেষ্টা করবে সঠিক উত্তর লিখার। অবান্তর কোন কিছু লিখে আসবে না।
৫। নটর ডেমে পড়ে এমন কোন বড় ভাইয়া থাকলে তার সাথেও প্রস্তুতি সম্পর্কে কথা বলতে পারো।

★ ঢাকার বাইরে থেকে এসে এই কলেজে পড়তে গেলে থাকা-খাওয়া নিয়ে কি ধরনের সমস্যা হবে?
– এটা খুব কমন প্রশ্ন। থাকার সমস্যার কথা চিন্তা করে ঢাকার বাইরের অনেকেই এই কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ফরম নেয় না। কলেজের নিজস্ব ছাত্রাবাসে থাকা না গেলেও কলেজের পাশেই আরামবাগে অনেক ছাত্র হোস্টেল আছে। নটর ডেম কলেজের অধিকাংশ ছাত্রই সেখানে থাকে। থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও ভালো। এসব হোস্টেল কলেজের একেবারে সাথেই বলা চলে। হোস্টেল থেকে কলেজে যেতে ২ মিনিট সময় লাগে। তাই থাকা খাওয়ার ব্যাপারে চিন্তার কোন কারণ নেই।

সবার জন্য শুভকামনা।

পরামর্শ দিয়েছেন-

নটর ডেম কলেজের
মুসতাকিম আহমেদ সানি (১৩ ব্যাচ)
কামরুল হাসান সাব্বির (১৪ ব্যাচ)
শাওন সেতু (১৫ ব্যাচ)
মিফতাউল ইসলাম পান্থ (১৫ ব্যাচ)
সাহাবি মাহমুদ অনন্ত (১৭ ব্যাচ)
জামিউল হক দীপ্ত (১৭ ব্যাচ)

Comments

comments

Comments are closed.