প্রচ্ছদ > স্বাস্থ্য > বিশেষজ্ঞ পরামর্শ > বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা
বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা

বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা

প্রেমের বিয়ে রায়ান ও রাইসার। সুখেই কাটছিলো দাম্পত্য জীবন। কিন্তু দুই বছর পর সন্তান নিতে গিয়ে ঘটল বিপত্তি। জন্মের পরই মারা যায় প্রথম সন্তান। তাদের জীবনে এ ঘটনা ঘটে আরও দুবার। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে ধরা পড়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ।
অন্যদিকে রাজীব সুস্মিতা দম্পতির পাঁচ বছরের মেয়ের শরীরে ধরা পড়েছে থ্যালাসেমিয়া। ডাক্তার বলেছেন, তারা উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক। মেয়ের এমন পরিণতি দেখে এখন শুধুই আফসোস তাদের-আহা, বিয়ের আগে রক্তের পরীক্ষাটা যদি করা হতো! বিয়ের আগে পাত্র বা পাত্রী, তাদের পরিবার,আত্মীয়-স্বজন, উপার্জন এসব নিয়ে আমরা ভালোই খোঁজখবর নেই। কিন্তু বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর রক্তের বিভিন্ন জরুরি পরীক্ষা নিয়ে আমরা মোটেই ভাবি না। অবশ্যই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা উচিত।

কেন এই রক্ত পরীক্ষা
বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা জরুরি। পাত্র বা পাত্রী যে কোন একজনের দেহে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস থাকলে অন্যজন আক্রান্ত হবে। অনাগত সন্তানকেও করবে সংক্রমিত। পৃথিবীর অন্যতম ঘাতক ব্যাধি এটি। তাই বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত পাত্র-পাত্রীর হেপাটাইটিস-বি আছে কিনা।
রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ধরা পড়বে এইডসের জীবাণু। পরীক্ষা করে দেখতে হবে পাত্র-পাত্রী সিফিলিসের জীবাণু বহন করছে কি না। ভিডিআরএল পরীক্ষায় সেটা ধরা পড়বে। সিফিলিসে আক্রান্ত বাবা-মায়ের সন্তান বিকলাঙ্গ হতে পারে।
পাত্র-পাত্রী থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে তাদের সন্তানও এ রোগে আক্রান্ত হবে। রক্ত পরীক্ষা করিয়ে দেখতে হবে পাত্র-পাত্রী থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না।

রক্তের গ্রুপ
ব্লাড গ্রুপগুলো হল ‘এ পজেটিভ’, ‘এ নেগেটিভ’, ‘বি পজেটিভ’, ‘বি নেগেটিভ’, ‘এবি পজেটিভ’, ‘এবি নেগেটিভ’, ‘ও পজেটিভ’ এবং ‘ও নেগেটিভ’। প্রধানত রক্তের গ্রুপে দুইটি বিষয় থাকে। একটা হল এবিও পদ্ধতি (এ, বি, এবি এবং ও) অন্যটা আরএইচ ফ্যাক্টর (আরএইচ পজেটিভ এবং আরএইচ নেগেটিভ)। এই রেসাস ফ্যাক্টরই ঠিক করে দেয় ব্লাডগ্রুপ পজেটিভ হবে, না নেগেটিভ হবে।

অন্য গ্রুপের রক্ত নিলে
যখন কোনো নেগেটিভ গ্রুপের ব্যক্তিকে পজেটিভ গ্রুপের রক্ত দেওয়া হয় তখন প্রথমবার সাধারণত কিছু হবে না। কিন্তু এর বিরুদ্ধে রোগীর শরীরে এন্টিবডি তৈরী হবে যার ফলে যদি কখনো রোগী আবার পজেটিভ রক্ত নেয় তাহলে তার রক্তের সেলগুলো ভেঙ্গে যাবে। এ কারণে জ্বর এমনকি কিডনি অকেজো হতে পারে।  ঘটতে পারে হঠাৎ মৃত্যু। এই সমস্যাকে চিকিৎসাবিদ্যায় বলা হয় এবিও ইনকমপ্যাটিবিলিটি।

স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ
স্বামীর রক্তের গ্রুপ যদি পজেটিভ হয় তাহলে স্ত্রীর পজেটিভ হতে হবে। আর যদি স্বামীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হয়, তাহলে স্ত্রীর পজেটিভ বা নেগেটিভ যে কোনো একটি হলেই হবে। তবে স্বামীর গ্রুপ যদি পজেটিভ হয় তাহলে কোনোভাবেই স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হওয়া চলবে না। এক্ষেত্রে স্ত্রীর গ্রুপ যদি নেগেটিভ হয় তাহলে তার স্বামীর রক্তের গ্রুপ অবশ্যই নেগেটিভ হতে হবে।

ঝুঁকির আশঙ্কা

মায়ের রক্তের গ্রুপ

বাবার রক্তের গ্রুপ

ঝুঁকি

এ+, বি+, ও+ বা এবি+

এ+, বি+, ও+ বা এবি+,এ-, বি-, ও- বা এবি-

ঝুঁকি নেই।

এ-, বি-, ও- বা এবি-

এ-, বি-, ও- বা এবি-

ঝুঁকি নেই।

এ-

এ+

১৬%

বি+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

ও+

১৬%

এবি+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

বি-

এ+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

বি+

১৬%

ও+

১৬%

এবি+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

ও-

এ+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

বি+

বাচ্চার রক্তে গ্রুপের ওপর নির্ভর করে ২-১৬% ঝুঁকি।

ও+

১৬%

এবি+

২%

এবি-

এ+, বি+, ও+ বা এবি+

১৬%

স্বামীর পজেটিভ, স্ত্রীর নেগেটিভ হলে
রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে কোন সমস্যা হয় না। তবে স্ত্রী যদি নেগেটিভ হয় আর স্বামী যদি পজেটিভ হয় তাহলে ‘লিথাল জিন’ বা ‘মারন জিন’ নামে একটি জিন তৈরি হয় যা পরবর্তীতে জাইগোট তৈরিতে বাঁধা দেয় বা জাইগোট মেরে ফেলে। সে ক্ষেত্রে মৃত বাচ্চার জন্ম হয়। বাচ্চা হতে পারে বর্ণান্ধ। যদি স্বামীর রক্তগ্রুপ পজেটিভ হয় তাহলে সাধারনত বাচ্চার রক্তের গ্রুপ ও পজেটিভ হবে। যখন কোনো নেগেটিভ গ্রুপের মা ধারন করবে পজেটিভ ফেটাস (ভ্রুণ) তখন সাধারনত প্রথম বাচ্চার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু ডেলিভারির সময় পজেটিভ ভ্রুণের রক্ত, প্লাসেন্টা (গর্ভফুল)’র বাধা ভেদ করে
মায়ের শরীরে প্রবেশ করবে। মায়ের শরীরে প্রসবের সময় যে রক্ত প্রবেশ করবে, তা প্রসবের কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের শরীরে আরএইচ এন্টিবডি তৈরী করবে। যখন মা দ্বিতীয় সন্তান বহন করবে, তখন যদি তার ভ্রুণের ব্লাড গ্রুপ পুনরায় পজেটিভ হয়। তাহলে মায়ের শরীরে আগে যেই এন্টিবডি তৈরি হয়েছিলো সেটা প্রাসেন্টা বাধা ভেদ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করবে। আর যখন ভ্রুণের শরীরে ঢুকবে তখন ভ্রুণের লোহিত রক্ত কণিকার সেল ভেঙে যাবে। এই সমস্যাকে চিকিৎসা বিদ্যায় বলা হয় আরএইচ ইনকমপ্যাটিবিলিটি।

রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে নয়
চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের একটা রেওয়াজ আমাদের সমাজে এখনো আছে। কিন্তু এই সম্পর্কে জিনগত কিছু সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

Comments

comments

Comments are closed.