প্রচ্ছদ > স্বাস্থ্য > মানসিক সমস্যা > রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে
রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে

রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন কীভাবে

রাগ একটি স্বাভাবিক অনুভূতি, যা সবার মধ্যেই থাকে, থাকাটাই স্বাভাবিক। অতএব, এর বহিঃপ্রকাশটিও স্বাভাবিক উপায়ে, আচরণের মাধ্যমে করা সম্ভব। রাগকে আপনি এখন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করুন, তা না হলে রাগই আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে। পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিকের সিনিয়র কনসালট্যান্ট তামিমা তানজিন

কেন মনে রাগ বাসা বাঁধে?
ধরুন, আপনি একজন কর্মজীবী নারী, সকালে সংসারের অর্ধেক কাজ করে কারো কাছে সংসার ও বাচ্চাকে বুঝিয়ে দিয়ে অফিসে তাড়াহুড়ো করে রওনা হচ্ছেন, আপনার কাজের মহিলাটি এরই মধ্যে একটি ঝামেলা বাধাল_প্রচণ্ড রাগ হলো আপনার। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম লেগে অফিসে সময়মতো পৌঁছানোর কোনো সম্ভাবনা নেই- রাগ! দেরিতে অফিসে পৌঁছে বসের কাছে কটু কথা শুনলেন_রাগ! সারাটা দিন নাক-মুখ ডুবিয়ে কাজ করলেন; তার পরও আপনার কর্মদক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন_রাগ! ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরলেন, দেখলেন বাচ্চাটা সারা দিন কিছু খায়নি, বাসায় লোকজন আপনার বাচ্চাকে নিয়ে একগাদা অভিযোগ করছে আপনার কাছে_যেন সব দোষ আপনার, অথচ আপনি নিজেই তখন পরিশ্রান্ত ও ক্ষুধার্ত। নিরীহ বাচ্চা অথবা কাজের মেয়ের ওপর গিয়ে পড়ল আপনার রাগ।

রাগ নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি জেনে নেওয়া যাক-
এক.
প্রথম কথা, মনে-প্রাণে বিশ্বাস আনুন- রাগ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন সম্ভব।
মন থেকে এই বিশ্বাসগুলো ঝেড়ে ফেলে দিন- ‘আমি আমার বংশের রাগ পেয়েছি, ‘আমার রাগ স্বয়ংক্রিয়।’ ‘কিছু বোঝা বা শোনার আগেই যা ঘটার ঘটিয়ে ফেলি।’ ‘দুনিয়াটা শক্তের ভক্ত নরমের যম, মাইরের ওপর ওষুধ নাই’ ইত্যাদি।

দুই
রাগের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবুন। ঘন ঘন রাগ অথবা তীব্র রাগ শরীরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মাথা ধরা হয় ও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। এগুলো তো গেল শারীরিক নেতিবাচক দিক। সামাজিক ও মানসিক নেতিবাচক দিকগুলো আরো ভয়াবহ। যেমন- রাগী মানুষ আইনগত জটিলতা, মামলা হওয়া, পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়া, প্রিয়জনদের সঙ্গে সম্পর্ক হারানো, মাদকনির্ভরতা ইত্যাদি হতে পারে। তারা ন্যায্য কথা বললে তা মানুষের কাছে মূল্যায়ন পায় না। কেবল তার রাগটিই সবার কাছে বড় হয়ে যায়। তার প্রতি মানুষের কোনো ভালোবাসা বা শ্রদ্ধাবোধ তো থাকেই না, বরং ঘৃণা, বিরক্তি, রাগ ও ভয় থাকে। সর্বোপরি একজন রাগী ব্যক্তি ভীষণ একা হয়ে পড়ে।

তিন.
আক্রমণাত্মক না হয়ে নিজের রাগের বিষয়টি প্রকাশ করাটাই রাগ নিয়ন্ত্রণের সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। শান্তভাবে, ইতিবাচক উপায়ে আপনি কী নিয়ে বিরক্ত বা রাগ সেটি অপর পক্ষকে জানান, তার উত্তর যা-ই হোক না কেন। মনের মধ্যে রাগ চেপে রাখা বা পুষে রাখা স্বাস্থ্যকর নয়। বরং এতে রাগের বোঝা বড় হতে থাকবে এবং একটা সময় প্রচণ্ডভাবে বিশ্রী উপায়ে প্রকাশ পেতে পারে।

চার.
রাগ নিয়ন্ত্রণে অনেকেই মেডিটেশন করে থাকেন। রিলাক্সেশন করেও আপনি আপনার রাগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন। ধীরে ধীরে শ্বাস টেনে পেটের মধ্যে কয়েক সেকেন্ড (৪/৫ সেকেন্ড) ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়ার ব্যায়ামটি করুন কয়েকবার। এ ছাড়া মাংসপেশির শিথিলায়ন ও কল্পনার সাহায্যেও সুন্দর কিছু শিথিলায়ন পদ্ধতি আছে-যা রাগ নিয়ন্ত্রণে খুবই কার্যকর।

পাঁচ.
যে পরিবেশ-পরিস্থিতি আপনার রাগের উদ্রেক করে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিত্যাগ করুন। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে, মনকে শান্ত করে তবেই সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবতে বসুন বা মোকাবিলা করুন যুক্তিযুক্ত উপায়ে। কথায় আছে- ‘রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন।’

ছয়.
কিছু কিছু বিষয়কে ছেড়ে দেওয়ার মনমানসিকতা তৈরি করুন। যেমন- যাকে নিয়ে আপনি বিরক্ত, চিন্তিত বারবার বলা সত্ত্বেও আপনার কথা সে মূল্যায়ন করছে না; এ অবস্থায় আপনার রাগ চরমে উঠে যেতে পারে। তাকে নিয়ে চিন্তা করাই বাদ দিন। সাধারণত পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের আচরণ করে থাকে। যেমন- উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে পরীক্ষার বেশি দিন নেই, কিন্তু মোবাইলে বন্ধুর সঙ্গে আলাপ, ফেসবুক, ইন্টারনেট ও টিভি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বোঝাতে গেলে বিরক্ত হয়, উল্টো চিৎকার করে ওঠে। এদের বিষয়ে কী করবেন, তা সুবিবেচক কারো সঙ্গে আলাপ করুন, তবে আপাতত নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেসব বিষয় চিন্তা আপনার রাগের কারণ সেগুলোকে কম প্রশ্রয় দিতে চেষ্টা করুন। আপনার মন সুস্থ থাকবে ফলে আরো অন্য কোনো বিকল্প চেষ্টার কথা আপনি ভাবতে পারবেন।

সাত.
নিজের সম্পর্কে, অন্যদের সম্পর্কে ও পারিপাশ্বিকতা সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তার ধরনটা বদলে ফেলুন। এ ছাড়া চরমপন্থী চিন্তাগুলোকেও (কখনোই, একদম, সব সময়ই, অবশ্যই হতে হবে) বাদ দিন এবং চিন্তার মাঝে নমনীয়তা রাখুন।

আট.
নিরাপদ কারো সঙ্গে দুঃখ-কষ্ট, হতাশা, সাংসারিক এবং দাম্পত্যজীবনের জটিলতা নিয়ে আলাপ করুন। নিজেকে হালকা রাখুন। রাগের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না; কেননা তাতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। প্রয়োজনে কারো সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিন।

নয়.
অনেকে ধর্মচর্চার মাধ্যমে নিজের রাগের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। নামাজের মাধ্যমে শান্তি খুঁজে পান, বিধাতার কাছে সব কিছু প্রকাশ করেন বা সব কথা জমা রেখে আশ্বস্ত বোধ করুন। যার প্রতি রাগ তাকে ক্ষমা করাও আমাদের ধর্মেরই একটি অংশ।

দশ.
লক্ষ করুন, দায়িত্ব, সংসার, কাজ- সব কিছুর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলছেন কি না। নিজের মনের ক্ষুধা নিবারনে কিছু করছেন কি না? শপিংয়ে যাওয়া, পছন্দমতো গানের সিডি কেনা, গান শোনা, টিভি দেখা, বন্ধু-প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্পের সময়-সুযোগ তৈরি করে নেওয়া, সব কিছু থেকে দূরে প্রকৃতির মধ্যে একটু বেরিয়ে আসা ইত্যাদি আপনার মনকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। মনের মধ্যে জমে থাকা রাগের আবর্জনা নির্মল বাতাসে ঝেড়েমুছে ফিরে আসুন আবার সংসারে।

Comments

comments

Comments are closed.