প্রচ্ছদ > ভ্রমণ > বৃষ্টি দেখতে চাইলে যেতে হবে জাহাঙ্গীরনগরে
বৃষ্টি দেখতে চাইলে যেতে হবে জাহাঙ্গীরনগরে

বৃষ্টি দেখতে চাইলে যেতে হবে জাহাঙ্গীরনগরে

মাহতাব হো‌সেন

ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। সারাদিন ছুটি। বৃষ্টিতে ব্যস্ত নগর ছাড়তে হবে। দাঁত ব্রাশ করে, প্রায় ভিজেই বেরিয়ে পড়ি। এমন দিনে ঘরে থাকা মুশকিল। রবীঠাকুর বলেছিলেন ‘ঘন ঘোর বরিষায়…’ আজ ঠিক তেমনই দিন। মনে হলো এই দিনে ঘরে বসে থাকা রীতিমতো অন্যায়।

ধামরাইগামী ডি-লিংক বাস থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেটে যখন নামলাম তখনও বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু তেজ কম। এসব দিনে ঢাকা থেকে গেলে আমিনবাজার অতিক্রম করার পর থেকেই ভালো লাগা শুরু হবে। রাস্তায় জ্যাম নেই, পরিষ্কার। দুই ধারের গাছগুলো আরো সবুজ হয়ে গেছে। ডেইরি গেটে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের রমিজ তারেক। রিকশা নিয়ে দুজনে টারজান পয়েন্ট হয়ে ট্রান্সপোর্টে চলে গেলাম। বৃষ্টি হচ্ছিলই। বলাবাহুল্য বর্ষায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইঞ্চিই সৌন্দর্যে মেখে থাকে, সৌন্দর্য ছড়ায়।

ট্রান্সপোর্টে চা খেয়ে পুরাতন কলাভবনের লেকের ধারে বসলাম। শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। লেকের ধারে সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গা থেকে নড়লাম না। বৃষ্টির ছিটেফোঁটা গায়ে এসে লাগছে। একটা সময় মনে হচ্ছিল ভিজে যাচ্ছি, তখনই চলে এলো প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম। মাহি আমার পূর্বপরিচিত। আমি পেশাদার কাগজপত্রের সাথে যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই তাঁর সাথে পরিচয়।

বিজনেস ফ্যাকাল্টির সামনের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়দফা চা খেলাম। বাইরে অবিরাম বর্ষণ। এরই মধ্যে ছাতা নিয়ে জনি চলে এলো। জনি আমার এলাকার ছেলে, রংপুরের। এবার চাচ্ছিলাম বেশ আয়োজন করে বসে বৃষ্টি দেখবো। যদিও জাহাঙ্গীরনগরের যেখানে ইচ্ছে সেখানেই বৃষ্টি দেখা যায়। বলেছিলাম প্রতিটি ইঞ্চিই সৌন্দর্যের, এত সবুজের মধ্যে বৃষ্টি ক্যাম্পাসের যেকোনো জায়গাতেই মুগ্ধতা ছড়ায়।

মেডিক্যাল সেন্টারের সামনের লেকে পানির ওপরে বাঁশ দিয়ে বসার জায়গা মতো বানানো হয়েছে। সেখানে যাওয়ার জন্য বাঁশের সাঁকো। একদিকে খড়ের ছাউনি, অন্যদিকে ফাঁকা। বৃষ্টির দেখার জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে। লেকের জলে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির গতি বেড়ে গেছে। আলো যেমন আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে তেমনি লেকের জলে বৃষ্টি পড়ে মুখে ছিটে এসে লাগছে। অপার্থিব ভালোলাগা গোটা শরীরে ছড়িয়ে যায়। চারদিক আকাশ কালো করে অন্ধকার নেমেছে। কেউ কেউ ছাতা নিয়ে বাঁশের মঞ্চের সামনে চলে যাচ্ছে। দু-একজন মেয়ে দুই হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ করে বৃষ্টিতে নিজেদের মেলে দিয়েছে। মুখে মুক্তোর মতো বৃষ্টি পড়ে ছিটকে পড়ছে। যেন ভুল করে অন্য জগতে ঢুকে পড়েছি।

দুজন ছেলেমেয়ে নৌকা বানিয়ে একসাথে পানিতে ছেড়ে দিচ্ছে। নৌকা একসাথে পানিতে ছেড়ে দিলে কি হয়? প্রেম? বন্ধুত্ব? আমার জানা নেই। ‘আজ ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে… জানি নে…’ এক মেয়ে গান ধরেছে। কিন্নর কণ্ঠ বুঝি একেই বলে। বাকিরা চুপ। মিনিটখানেকের মধ্যেই তন্ময় হয়ে গেছে বাঁশের মঞ্চের সবাই। গান যে গাচ্ছে সে সম্ভবত ফার্স্ট ইয়ারের শিক্ষার্থী। পায়ের নিচে জল। মাথার ওপরে জল।

জনি নামাজ পড়তে গেল। ভিজে একাকার হয়ে যখন ফিরলো তখন তাঁর হাতে ছিল মসলা মাখানো পেয়ারা। লেকের ওই জায়গা থেকে যেন সরতেই ইচ্ছে করছিল না। লেকের জলে টুপ করে পড়া প্রতিটি জলের ফোঁটাতেই যেন ছড়িয়ে পড়ছে ভালোলাগা। কয়েক ঘণ্টা ছিলাম ওই বাঁশের মঞ্চে! মনে নেই কিংবা অনুমান নেই।

জাহাঙ্গীরনগর গেলে দুপুরে বটতলায় খেয়ে আসতে হবে। এটাই যেন নিয়ম। রমিজ ছাতা নিয়ে বটতলা চলে গেল। আমি জনিকে সাথে নিয়ে রিকশায় চড়ে বসলাম। জহির রায়হান মিলনায়তন, ক্যাফেটেরিয়া হয়ে মীর মোশাররফ হলের সামনের রাস্তা দিয়ে আমাদের রিকশা ছুটে চলল। বর্ষাকালে এই রাস্তা দিয়ে না আসলে বৃষ্টিযাপনই বৃথা। দুই দিকে ঘন বনের মতো। মাঝখান দিয়ে উঁচুনিচু মসৃণ রাস্তা চলে গেছে। একফোঁটাও ময়লা নেই। বৃষ্টি সব গিলে ফেলেছে। এই রাস্তায় রিকশা ভ্রমণের সময় চাইলে হুড নামিয়ে দিতে পারেন। এমন সুন্দর জায়গায় ভিজতে ইচ্ছে করতেই পারে। রাস্তা চলে গেছে বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনে দিয়ে। বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় সবুজ ক্যাম্পাস, জলে ভেজা পাতা। আমাদের রিকশা ছুটে যাচ্ছে বটতলা..

ভিডিও

 

 

 

 

 

Comments

comments

Comments are closed.