প্রচ্ছদ > ভ্রমণ > দূরে কোথাও > তাজিংডং হয়ে রেমাক্রি
তাজিংডং হয়ে রেমাক্রি

তাজিংডং হয়ে রেমাক্রি

মো. নিজাম উদ্দিন
সেবার বান্দরবান ভ্রমণে দুই বন্ধু সঙ্গী হয়েছিল। জানুয়ারি মাস শেষ হতে চলেছিল তখন। ঢাকার ফকিরাপুল থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাস রাত সাড়ে দশটায় ছাড়ল। পরদিন সকাল সাতটায় বান্দরবান পৌঁছাই।  থানছি বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করি। সকাল আটটায় গাড়ি ছোটে থানছির দিকে।  চার ঘন্টা সময় লাগে। দুপুর বারোটায় পৌঁছে  থানছি। পেট পুরে খেয়েদেয়ে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করি। স্থানীয় ছেলে মামুন আমাদের বিজিবি ক্যাম্পে নিয়ে গেল। নাম পরিচয় লিখে দুপুর দুইটায় মামুনকে নিয়ে বোর্ডিং পাড়ার উদ্দেশ্য হাটা দিই। সাড়ে পাঁচটায় বোর্ডিং পাড়া পৌঁছে যাই। ততক্ষণে আঁধার ঘন হয়ে এসেছিল। পাহাড়ে সূর্য একটু তাড়াতাড়িই বিশ্রামে যায়। জুমের চাল আর মুরগির মাংস দিয়ে রাত্রি ভোজের আয়োজন করি। রাতে থাকি বোর্ডিং পাড়াতেই। পর দিন সকালে রওনা দিয়ে শেরকর পাড়ায় পৌঁছি। সকালের নাস্তার জন্য ভাত ও মিষ্টি কুমড়া রান্নার ফাঁকে কিছুটা বিশ্রাম করে নেই। নাস্তা সেরে তাজিংডংয়ের  উদ্দেশ্যে রওনা দেই এবং দুপুর নাগাদ চুড়াই উঠে পড়ি। তারপর সিম্পলাম্পি পাড়া হয়ে সন্ধ্যার দিকে তান্দুই পাড়া পৌঁছি। রাতের খাবার ছিল বারবিকিউ করা মুরগি। তান্দুই পাড়া থেকে পরদিন সকালের নাস্তা সেরে ঝিরি পথ ধরে নেপিউ পাড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। তান্দুইপাড়ার কারবারী সিমথনকে অতিরিক্ত গাইড হিসেবে নিয়ে যাই। তিনি আমাদের সাকাহাফং পাহাড়ে নিয়ে যাবেন। সাকাহাফং বেসরকারীভাবে দেশের সর্বোচ্চ পাহাড়।  উচ্চতা ৩৪৮৮ ফুট। রেমাক্রি খাল হয়ে চম্বক ও নেপিউ ঝর্না দেখে একটি নাম না জানা ঝর্নার কাছে পৌঁছাতেই আমার দুই বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে। তারা আর হাটতে পারছিল না। আমি মামুনকে তাদের কাছে রেখে  সিম&থনকে নিয়ে রওনা দিই। নেপিউ পাড়ায় ব্যাগ রেখে টুকিটাকি কিছু জিনিস নিয়ে সাকাহাফং যাত্রা করি। ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে  চলতে থাকলাম। শরীরে অঁাচড় লাগলেও নজর দেওয়ার সময় পাইনি। আমি ‘আমাদের এভারেষ্টে’ যাচ্ছি ভাবতেই অন্যরকম লাগছে। চূড়ায় উঠতেই মন ভরে গেল। দূরে মায়ানমার দেখা যাচ্ছে। অনেক ছবি তুলে দুজনে বিস্কুট দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এবার নামার পালা। পাহাড় থেকে নামার সময় খুব সাবধান থাকতে হয়। শরীরের নিয়ন্ত্রন রাখা সহজ হয় না।
যাহোক নেপিউ পাড়া পৌঁছে দেখি আমার দু’বন্ধু ভাত ও মুরগির মাংস রান্না করে রেখেছে। খুব ভাল করে খেলাম। রাতে খেয়েছিলাম রেমাক্রি খাল থেকে ধরে আনা মাছ।
পরদিন সকালে সাজাইপাড়া রওনা হই।  আমার দুই বন্ধুকে সাজাইপাড়া রেখে গাইড মামুন ও  পাড়ার নয়নকে নিয়ে আমি আমিয়াখুম ঝর্না, নাক্ষিয়াং ও সাতভাইখুম দেখতে রওনা দেই। সাজাই পাড়া থেকে প্রথমে দুইটি পাহাড়ে উঠতে হয়। একটু কষ্টকর, পরে শুধু নামতে হয়। রেমাক্রি খাল হয়ে সাত ভাই পাথর, সাত ভাইখুম দেখে নাক্ষিয়াং পৌঁছি। বড়বড় পাথর ও ঝর্ণার পানির শব্দে জনমানবহীন পরিবেশ খুবই সুন্দর লাগছিল। বাঁশের ভেলা দিয়ে নাক্ষিয়াং থেকে আমিয়াখুম ঝর্না দেখতে যাই। বিস্কুট দিয়ে কোনোমতে দুপুরের খাবার সারলাম। ফেরার পথে ক্ষিধেয় আমার হাটতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। নয়ন আমাকে দুটি কলা গাছের ভিতরের অংশ কেটে দেয়, তা খেয়ে খানিক স্বসি্ত পেয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগেই সাজাইপাড়া পৌঁছেছিলাম।
রাতে ভালো ঘুমাতে পারিনি। ঘরের বেড়ার ফাঁক গলে আসা কনকনে বাতাসে কিছু ক্ষণ পর  পর ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। ঘরের মধ্যে চুলায় আগুন পোহাতে পোহাতে সকাল হয়ে গেল।
পরের দিন সকালে রওনা দিয়ে নাফাখুম ঝর্না হয়ে রেমাক্রি বাজারে পৌঁছেছি। রেমাক্রি রষ্টে হাউজে রাতে থাকার ব্যবস্থা করি। সন্ধ্যায় ওমেদু দিদির ঘরে খাই। রাতে শেষ বারের মত মুরগির বারবিকিউ করি। পরদিন সকালে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় বড় পাথর হয়ে থানছি ফিরে আসি।

কীভাবে যাবেন
ঢাকার ফকিরাপুল থেকে এস. আলম, হানিফ, শ্যামলী সহ আরো কিছু পরিবহনের বাস বান্দরবান যায়। ভাড়া ৬২০ টাকা। বান্দরবান থেকে থানছি জনপ্রতি ২১০ টাকা। পুরো যাত্রায় তিনজনের একটা দলে জনপ্রতি খরচ সাত হাজার টাকার মতো।

Comments

comments

Comments are closed.