প্রচ্ছদ > ক্যারিয়ার > চাকরির বাজার > প্রকাশনা জগতে নানা পেশা
প্রকাশনা জগতে নানা পেশা

প্রকাশনা জগতে নানা পেশা

আরাফাত শাহরিয়ার :::
দিন দিন পাঠকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রসার ঘটছে প্রকাশনা শিল্পেরও। ফলে বিস্তৃত হচ্ছে প্রকাশনা শিল্পে চাকরির বাজার। পাণ্ডুলিপি সম্পাদক, কম্পোজিটর, প্রুফ রিডার, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শিল্পী, প্লেট মেকার, উত্পাদন ব্যবস্থাপক এবং অনুবাদক হিসেবে এই পেশায় কাজের সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে কথা বলে এসব চাকরির খোঁজখবর জানানো হয়েছে এবারের প্রতিবেদনে

পাণ্ডুলিপি সম্পাদক
বিদেশে পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আমাদের দেশে এ ক্ষেত্রটির তেমন বিকাশ ঘটেনি। তবে আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। যে বিষয়ের সম্পাদনা করবেন, সে বিষয়ে পরিষ্কার জ্ঞান থাকতে হবে। পাশাপাশি বইয়ের মেকআপ সম্পর্কেও ভালো ধারণা থাকতে হয় তাঁর। সম্পাদনার কাজ করে সম্মানজনক উপার্জন সম্ভব।

কম্পোজিটর
প্রকাশনা শিল্পে কম্পোজিটরদের কাজের বেশ বড় একটি ক্ষেত্র রয়েছে। ঐতিহ্যর কম্পোজিটর জহিরুল ইসলাম জানান, এই পেশায় আসার জন্য কম্পিউটারে বাংলা বা ইংরেজি টাইপ জানা প্রয়োজন। কম্পোজিটর হতে চাইলে আপনার আশপাশের কোনো কম্পিউটার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ  নিতে পারেন। এ পেশায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা মাসিক আয় সম্ভব। এই পেশায় ভালো করার জন্য টাইপিংয়ের গতি ভালো হওয়াটা খুব জরুরি বলে জানান জহিরুল। গতি বাড়াতে আগ্রহীদের  বেশি বেশি অনুশীলনের পরামর্শ দেন তিনি।

প্রুফ রিডার
বানান রীতি সম্পর্কে ভালো দখল থাকলে আপনি প্রুফ রিডার হিসেবে কাজের সুযোগ পেতে পারেন। এ ছাড়া প্রুফ দেখার নিয়মগুলো তো জানতেই হবে। এ পেশায় আসতে কী কী যোগ্যতা প্রয়োজন জানতে চাইলে ঐতিহ্যর প্রুফ রিডার শতাব্দী কাদের জানান, প্রুফ কাটার কিছু চিহ্ন বা প্রতীক আছে। এগুলো আয়ত্ত করতে হবে। অনেক অভিধানের শেষের দিকে এ বিষয়ে নির্দেশনা থাকে। এর বাইরে দক্ষ কারো কাছ থেকে এসব নিয়ম শিখে নিতে পারেন। আর পেশাটিতে ভালো করতে ভাষা সম্পর্কে ভালো ধারণার প্রয়োজন বলে জানান শতাব্দী কাদের। তিনি বলেন, ‘এটি একজন দক্ষ প্রুফ রিডারের আবশ্যকীয় যোগ্যতা।’ ভালো কাজ জানলে এ পেশায় মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রুফ রিডারদের চাহিদা রয়েছে।

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ
কোনো বইয়ের জন্য প্রচ্ছদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রচ্ছদ বলতে আমরা বইয়ের কাভারের ডিজাইনকে বুঝে থাকি। আর বইয়ের ভেতরের পাতাগুলোয় আঁকাআঁকির যে কাজ করা হয়, তাকে বলা হয় অলংকরণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যিনি বইয়ের প্রচ্ছদ করেন, তিনি ভেতরের অলংকরণও করেন। প্রচ্ছদ আঁকা ও অলংকরণ করাকে পেশা হিসেবে নিতে চাইলে নিজের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা থাকতে হবে। আঁকার হাতও ভালো হতে হবে। যিনি যত বেশি সৃজনশীল, এ পেশায় তিনি তত ভালো করবেন। ড্রয়িং ভালো জানলে পেশাটিতে সফল হওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। আর পেশাটিতে আসার আগে এ বিষয়ে পড়াশোনা করে আসাই ভালো। এ পেশায় কাজের দক্ষতা অনুযায়ী ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা মাসিক আয় সম্ভব।

পেস্টিং
পেস্টিং বইয়ের প্রকাশনার ক্ষেত্রে শেষ ধাপগুলোর অন্যতম। পাণ্ডুলিপি কম্পোজ, সম্পাদনা ও প্রুফ বা রিডিংয়ের কাজ শেষে আউটপুট বা ট্রেসিং হয়ে গেলে শুরু হয় পেস্টিং। এ পেশায় আসার জন্য তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতার দরকার হয় না। প্রয়োজন নেই প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিরও। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পেস্টার হিসেবে কাজ করেন, এমন কারো সহকারী হিসেবে কাজ করতে করতে কাজটি শিখে নিতে পারবেন আগ্রহীরা। আর পেস্টারের বেতন হতে পারে মাসে ৮-১০ হাজার টাকা।

প্লেট মেকিং
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে পেস্টারের মতো প্লেট মেকারেরও চাহিদা রয়েছে। খুব বেশি পড়াশোনার দরকার হয় না। আর কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্লেট মেকার হিসেবে কিছু দিন কাজ করলে বিষয়টি আয়ত্তে চলে আসবে। প্লেট মেকার হিসেবে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা বেতন পাওয়া যায়।

উৎপাদন ব্যবস্থাপক
একজন প্রোডাকশন ম্যানেজার বা উৎপাদন ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বে ছাপার কাজটি হয়। উত্পাদন ব্যবস্থাপকের অধীনে একাধিক সহকারীও থাকেন। তাঁরা ব্যবস্থাপকের কাজে সহযোগিতা করেন। তিনি বই ছাপার জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু কেনা, প্রেস নির্বাচন, ছাপার মান নিয়ন্ত্রণ, ছাপার পর বাইন্ডিংয়ের জন্য পাঠানো- এসব কাজ তত্ত্বাবধান করেন। তাঁকে কাগজ ও ছাপার মান, রং, বাইন্ডিং ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষ হতে হয়। সাধারণত স্নাতক ডিগ্রিধারীরাই এ পেশায় কাজের সুযোগ পান। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে পেশাটিতে কাজের অভিজ্ঞতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন একজন উৎপাদন ব্যবস্থাপক।

বুক বাইন্ডার
বই ছাপা শেষ হলে শুরু হয় বাইন্ডিংয়ের কাজ। স্বল্পশিক্ষিত অনেকেই বুক বাইন্ডিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। বাংলাবাজার, নীলক্ষেত, ফকিরাপুলসহ অনেক স্থানেই ছোট-বড় অনেক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোয় বাইন্ডার হিসেবে কাজের সুযোগ রয়েছে। একজন বাইন্ডার মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় করতে পারেন। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষারও প্রয়োজন নেই।

বিপণন ব্যবস্থাপক
ব্যবসার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে বিপণনের ওপর। বইটিকে পাঠক বা ব্যবসায়ীদের সামনে তুলে ধরা ও কিনতে উত্সাহী করাটাই একজন বিপণন ব্যবস্থাপকের কাজ। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিপণন ব্যবস্থাপকের যথষ্টে চাহিদা রয়েছে। মার্কেটিং বিষয়ে পড়াশোনা করলে এ পেশায় ভালো করা সহজ। বাণিজ্য অনুষদের অন্য বিভাগে পড়লেও এ পেশায় সফল হওয়া সম্ভব। আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বা ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি হতে পারে- জানালেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম।

অনুবাদক
আজকাল বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে অনুবাদকের বেশ চাহিদা। ভালো অনুবাদ করতে পারলে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোয় খণ্ডকালীন কাজ করেও ভালো রোজগার সম্ভব। আমাদের দেশে ইংরেজি অনুবাদকের খুব চাহিদা রয়েছে। আর এ কাজে দক্ষতা দেখানোর জন্য শুদ্ধ বাংলাও ভালোভাবে জানা দরকার। ভাষার ব্যবহার জানাও অনুবাদকের অন্যতম যোগ্যতা। আর পেশাটিতে রোজগার নির্ভর করে অনুবাদকের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ওপর।

এবং অন্যান্য
এসব পেশার বাইরেও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কাজের অনেক ক্ষেত্র। প্রতিষ্ঠানের হিসাব সংরক্ষণের জন্য দরকার হিসাবরক্ষকের। এ ছাড়া মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, গবেষণা কর্মকর্তাসহ নানা পদ রয়েছে আধুনিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এসব পেশাও বেছে নিতে পারেন প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে।

প্রতিষ্ঠান হোক নিজের
ইচ্ছে করলে আপনিও হতে পারেন একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। এর জন্য ট্রেড লাইসেন্স ও টিন নম্বর থাকতে হবে। ইতি প্রকাশনের কর্ণধার জহির দীপ্তি এ বিষয়ে জানালেন, ছোট বা মাঝারি একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য নূ্যনতম দু-তিন লাখ টাকার পুঁজি দরকার। তবে এটা নির্ভর করে ব্যবসার ব্যাপ্তির ওপর। তিনি আরো জানান, সৃজনশীলতা, আগ্রহ ও একাগ্রতা না থাকলে এই প্রতিযোগিতামূলক পেশায় টিকে থাকা কঠিন।

ক্ষেত্র বাড়ছে
প্রকাশনা শিল্পে কাজের সুযোগ কেমন- এ প্রশ্নের জবাবে ‘বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’র নির্বাহী পরিচালক এবং আগামী প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী ওসমান গনি বলেন, ‘একসময় বইমেলায় স্টল দেওয়ার মতো প্রকাশক খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যেত না। আর এখন মেলায় প্রকাশনীগুলোর স্টল দেওয়ার জন্য স্থান পাওয়াটাই কঠিন। এতেই ধারণা করা যায়, কী পরিমাণে কাজের সুযোগ বেড়েছে প্রকাশনা শিল্পকে ঘিরে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনই পাঁচ শতাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আছে। এ সংখ্যা আরো বাড়বে। কারণ দিনে দিনে পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে।’

ক্যারিয়ার গড়তে
প্রকাশনা ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি সৃজনশীলতা-বললেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম। তিনি আরো বলেন, ‘প্রকাশনা অনেক বড় শিল্প। এ ক্ষেত্রে যে কেউই ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। তবে এ জন্য সৃজনশীল মানসিকতার অধিকারী হতে হবে।’ পেশাটিতে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে বলে অভিমত প্রকাশ করেন আগামী প্রকাশনীর ওসমান গণি। তিনি জানান, ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চাইলে কাজটি ভালো করে জেনে আসাটাই উত্তম।

Share and Enjoy !

0Shares
0 0

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*