প্রচ্ছদ > শিক্ষা > ফিচার > বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি
বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি

বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি

বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বপ্নের জায়গা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। বুয়েটে জায়গা করে নিতে তুমুল প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রস্তুতির নানা বিষয় ও ভালো করার কৌশল পিন্টু রঞ্জন অর্ককে জানিয়েছেন ২০১২ সালের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম নাফিস ইরতিজা তৃপ্ত

২ নভেম্বর বসছে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষার আসর। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা থেকে বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার ধরনটা একেবারেই আলাদা। অনেকেরই ধারণা, বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা মানেই কঠিন সব প্রশ্ন। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সে রকম নয়। ভর্তি পরীক্ষায় অধিকাংশ প্রশ্নই আসে মূল বই থেকে। হয়তো একটু এদিক ওদিক করে। মেধাবীরা এতে অবশ্য চিনি্তত হয় না। বরং চ্যালেঞ্জটা নিতে ভালোবাসে। যারা ভালো করে মূল বই পড়ে, তাদের সুযোগ বেড়ে যায়। কিন্তু যারা মূল বইয়ের খুঁটিনাটি না জেনে বাঁধাধরা মুখস্থবিদ্যার ওপর ভরসা রাখে, তাদের জন্য বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা অনেকটা এভারেস্ট টপকানোর মতোই কঠিন! কারণ এখানে একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক জ্ঞান যাচাই করা হয়।

২০১২ সালের বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম নাফিস ইরতিজা তৃপ্ত

২০১২ সালের বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম নাফিস ইরতিজা তৃপ্ত

এবার থাকছে না ইংরেজি
অন্যান্যবার ভর্তি পরীক্ষা হতো পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত আর ইংরেজি- এই চারটি বিষয়ের ওপর। এবারের ভর্তি পরীক্ষায় ইংরেজি থাকবে না। তার মানে গুরুত্ব দিতে হবে বাকি তিনটি বিষয়েই। এই তিনটি বিষয়েই ২০০ নম্বর করে মোট ৬০০ নম্বরের এমসিকিউ ও লিখিত পরীক্ষা হবে।

রসায়ন : মনে রাখতে হবে সংকেত
প্রথমেই আসি রসায়নের কথায়। উচ্চ মাধ্যমিকে তোমরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে আসায় মূল বই ভালো করে পড়ার কথা। মূল বইয়ের সব অধ্যায় ভালো করে বুঝে পড়তে হবে। বিভিন্ন রাসায়নিক নাম, বিক্রিয়া, পারস্পরিক রূপান্তর, নামকরণ বা সংকেত থেকেই প্রশ্ন থাকে বেশি। অনেকে রসায়ন দ্বিতীয় পত্রে একটু সমস্যায় পড়ে। এ বিষয়ের অনেক বিক্রিয়া ও সংকেত আছে, যা সহজে মনে থাকতে চায় না।
আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমারও একই অবস্থা ছিল। আমি সে জন্য রসায়নের বিক্রিয়া ও সংকেতগুলো বারবার পড়তাম। আর উচ্চ মাধ্যমিকের মূলটা ভালোভাবে পড়লে ও অনুশীলন করলে এ সমস্যা ধীরে ধীরে কেটে যাবে।

গণিত : মূল বই থেকে হুবহুও প্রশ্ন হয়
গণিতের ক্ষেত্রে অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। ক্যালকুলাস, দ্বিপদী ধারার যোগফল, সম্ভাব্যতা প্রভৃতি অধ্যায় থেকে প্রশ্ন থাকে। গণিতের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়, মূল বইয়ের প্রশ্ন হুবহু তুলে দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় মূল বইয়ের প্রশ্ন একটু ঘুরিয়ে করা হয়। দ্রুত গণিত সমাধানের জন্য ক্যালকুলেটরের সাহায্য নিতে হয়। তাই তোমাদের বলব, এখন সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরের ব্যবহার ভালোভাবে শিখে নাও। না হলে পরীক্ষার হলে গিয়ে সমস্যায় পড়তে পারো।

পদার্থবিজ্ঞান : সব অধ্যায়ে সমান গুরুত্ব
পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রে গতিবিদ্যাসহ প্রতিটি অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। আর দ্বিতীয় পত্রে চুম্বক, তড়িত্ শক্তি, তাপ, শব্দ, আলো- এসব অধ্যায় থেকে প্রায় প্রতিবছর রচনামূলক প্রশ্ন থাকে। আর নৈর্বযক্তিকের জন্য সব অধ্যায়ের গুরুত্ব সমান। তাই অবশ্যই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের ওপর বেসিক নলেজ থাকতে হবে। আর পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিটি অধ্যায়ের খুঁটিনাটি বিষয় মনোযোগসহকারে এবং অবশ্যই বুঝে পড়তে হবে। তাহলে সহজেই মনে থাকবে।

কোন বই পড়বে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়
এখনকার প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতে হবে। এ সময়টায় মনে একটু ভয় কাজ করতে পারে। মনে হতে পারে, যা পড়েছি সব ভুলে যাচ্ছি। আবার অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে- এ সময় কার বই পড়ব, কোন বই পড়ব। আসলে কোন লেখকের বই পড়বে সেটা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিটি বিষয়ে অন্তত দুজন লেখকের বই ভালোভাবে বুঝে পড়লে কাজে দেবে।
পদার্থবিজ্ঞান প্রস্তুতির জন্য অন্তত দুজন লেখকের বইয়ের সব ম্যাথ সলভ করা উচিত। শাজাহান-তপনের বইটা দেখা যেতে পারে। আবু ইসহাক-তোফাজ্জল হোসেন স্যারের বইটাও দেখতে পারো। আমি পদার্থবিজ্ঞানের জন্য তপন আর ইসহাক স্যারের বই, রসায়নের জন্য হাজারী আর কবির স্যারের বই, গণিতের জন্য আফসার আর হারুন রশিদ স্যারের বই দেখেছিলাম। যেকোনো বিষয়ের বই পড়ার সময় কোনো নতুন তথ্য কিংবা ব্যতিক্রম কিছু পেলে সেটা একটা খাতায় লিখে রাখতাম। কারণ পরীক্ষার আগে পুরো বই পড়া সম্ভব হয় না। এ রকম করে রাখলে পরীক্ষার আগের দিন চোখ বুলিয়ে নিলেই অনেক কাজ হবে।

কাজে দেবে প্রশ্ন সমাধান
পরীক্ষার আর বেশি বাকি নেই। এ সময়টায় বিগত বছরের প্রশ্নগুলো সমাধান করতে পারো। এতে করে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে যাবে, তবে বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নই খুব একটা রিপিট করা হয় না। ৩০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় সময় থাকে মাত্র দেড় ঘণ্টা। যারা দ্রুত লিখতে পারে, তাদের জন্য ভালো। তোমাদের উচিত নিয়মিত লেখার অভ্যাস করা। আর ঘড়ি ধরে লিখিত পরীক্ষার অনুশীলনও করা যেতে পারে। মনে রাখবে, অনুশীলনের কোনো বিকল্প নেই। আমি রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান আর গণিত বেশি বেশি অনুশীলন করতাম।

উত্তর না মিললেও নম্বর
পরীক্ষার হলে অবশ্যই মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। ভর্তি পরীক্ষায় সব প্রশ্নের আনসার করা যাবে- ব্যাপারটা কিন্তু তেমন নয়। অনেক সময় কম আনসার করেও সুযোগ পাওয়ার নজির আছে। একটা প্রশ্ন না পারা গেলে তার জন্য সময় নষ্ট না করে পরবর্তী প্রশ্নের উত্তরে চলে যেতে হবে। উত্তর দেওয়ার সময় অবশ্যই প্রশ্নের নম্বর মিলিয়ে নিতে হবে। কারণ পরীক্ষা ভালো দিলেও নম্বরে মিল না থাকলে সব পরিশ্রমই পণ্ড হয়ে যাবে। সাবধান থাকতে হবে এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ব্যাপারেও।
কারণ এমসিকিউ উত্তরের ক্ষেত্রে প্রতি চারটি ভুলের জন্য একটি সঠিক উত্তরের নম্বর কাটা যাবে। তাই অনুমাননির্ভর উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। অঙ্কে একটু বেশি সময় লাগতেই পারে। তাই বলে অর্ধেক করে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। পুরোটা শেষ করেই অন্য প্রশ্নে যাওয়া উচিত। আর লিখিত পরীক্ষায় উত্তর যথাযথভাবে না মিললেও নম্বর পাওয়ার সুযোগ আছে। তাই যতটা সম্ভব বেশি আনসার করে আসতে হবে। আর একটা বিষয়, ভর্তি পরীক্ষায় উত্তর লেখার জন্য নির্দষ্টি খাতা দেওয়া হয়।
আর নির্দিষ্ট উত্তর নির্দষ্টি জায়গায়ই লিখতে হয়। কোনো অতিরিক্ত খাতা দেওয়া হয় না। আর সব জিনিসের বেসিক কনসেপ্ট ঠিক রাখতে হবে, তাহলে প্রকৌশলের স্বপ্নের সিঁড়িতে পা রাখতে পারবে তুমিও!

পরীক্ষার ধরন

বুয়েটে আসন আছে মোট এক হাজার। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় গণিত, পদার্থ, রসায়ন এবং ইংরেজি বিষয়ে প্রাপ্ত জিপিএর যোগফলের ভিত্তিতে আট হাজার শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। এই চারটি বিষয়ে মোট ২০ পয়েন্টের মধ্যে যাঁদের ১৯ পয়েন্ট আছে, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন। সেখান থেকে প্রাথমিক বাছাই শেষে চূড়ান্ত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। বুয়েট ভর্তি পরীক্ষা হয় মোট ৬০০ নম্বরের। এর মধ্যে ৩০০ নম্বরে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন এবং বাকি ৩০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়ে থাকে। সময় মোট ৩ ঘণ্টা। এই ৩ ঘণ্টার মধ্যে দেড় ঘণ্টা এমসিকিউ আর বাকি দেড় ঘণ্টা লিখিত পরীক্ষার জন্য। এ বছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত-এই তিনটি বিষয়ের ওপর লিখিত এবং এমসিকিউ প্রশ্ন করা হবে।পদার্থ, রসায়ন, গণিত-এই তিনটি বিষয় থেকে ৪০টি করে মোট ১২০টি প্রশ্ন থাকবে এমসিকিউ পরীক্ষায়। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ২.৫ নম্বর করে মোট ৩০০ নম্বর নির্ধারণ করা হবে এ পরীক্ষায়। প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য .৬২৫ নম্বর করে কাটা যাবে। আবার লিখিত পরীক্ষায় পদার্থ, রসায়ন, গণিত-এই তিনটি বিষয়ের প্রতিটি থেকে ১০টি করে প্রশ্ন থাকে। প্রতিটি প্রশ্নের জন্য ১০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকে।

Share and Enjoy !

0Shares
0 0

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*