প্রচ্ছদ > স্বাস্থ্য > বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, > চশমার বিকল্প ল্যাসিক
চশমার বিকল্প ল্যাসিক

চশমার বিকল্প ল্যাসিক

চোখ নিজে দেখে না, দেখতে সাহায্য করে। তবে বহু কারণে সবাই একই রকম দেখতে পান না। কারো কারো ভালো দেখতে চশমার প্রয়োজন হয়। তবে এখন ল্যাসিক চিকিৎসার মাধ্যমে চশমা ব্যবহার ছাড়াও বহু মানুষের পক্ষে ভালো দেখা সম্ভব। লিখেছেন চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ কর্নেল (ডা.) মো. কামরুল হাসান খাঁন

চোখের পাওয়ারজনিত সমস্যা বা রিফ্ল্যাকটিভ এরর বহু মানুষের জন্যই প্রধান চক্ষু সমস্যা। বলা হয়, প্রতিটি পূর্ণ বয়সী মানুষ তার জীবদ্দশার কোনো না কোনো সময় এ সমস্যায় ভোগেন। কেউ খুব কম বয়সে দূরের জিনিস কম দেখেন আবার কেউ মধ্য বয়সে কাছে কম দেখেন। এসব ক্ষেত্রে সহজ সমাধান হচ্ছে চশমা ব্যবহার। কিন্তু এই চশমা ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে বিড়ম্বনার কারণও। বিশেষ করে খুব বেশি পাওয়ারের জন্য যাঁরা মোটা চশমা ব্যবহার করেন তাঁদের অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হয়। তাদের জন্য ল্যাসিক হতে পারে বিকল্প।

ল্যাসিক কী?
ল্যাসিক বা লেসার অ্যাসিস্টেড ইন সিটু কেরাটোমিলেসিস রিফ্যাকটিভ সার্জারির একটি পদ্ধতি। এটি নিকটদৃষ্টি, দূরদৃষ্টি ও অস্টিগম্যাটিজমের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। সাধারণত লেসারের মাধ্যমে চোখের কর্নিয়াকে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়। এভাবে কর্নিয়া চোখের ফোকাস ঠিক করতে সহায়তা করে এবং মানুষ আবার চশমা ছাড়াই স্পষ্ট দেখতে পায়।

ল্যাসিকে যা করা হয়
চক্ষু বিশেষজ্ঞ কর্নিয়ার ওপর ব্লেড বা লেসার দিয়ে পাতলা একটি আবরণ উন্মুক্ত করেন। এরপর লেসারের সহায়তার কিছু টিস্যু সরিয়ে ফেলেন। যাঁরা কাছে কম দেখতে পান  তাঁদের ক্ষেত্রে ল্যাসিকের মাধ্যমে কর্নিয়া একটু মোটা করে দেওয়া হয়, যাঁরা দূরে কম দেখতে পান, তাঁদের ক্ষেত্রে কর্নিয়া একটু পাতলা করে দেওয়া হয়। আর অস্টিগম্যাটিজমের ক্ষেত্রে অনিয়মিত তলের (ইরেগুলার) কর্নিয়াকে যথাসম্ভব সমতল (রেগুলার ও নরমাল) করা হয়।

ল্যাসিক পদ্ধতি
ল্যাসিক করার লেসারটির নাম এক্সাইমার। যদিও ব্যথার তেমন কোনো ব্যাপার নেই, তবুও ড্রপ আকারে চোখে কিছুটা অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করা হয়। ল্যাসিক করার সময় রোগী যাতে চোখ খোলা রাখতে পারে সে জন্য একটি বিশেষ ধরনের ফরসেপের সাহায্যে চোখের পাতা খুলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর শুরু হয় সার্জারির প্রক্রিয়া। এ সময় রোগী একটু কম দেখে বা ঝাপসা দেখে। আগে থেকেই ঠিক করে রাখা (প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা আলাদা পরিমাপ ঠিক করে নিতে হয় রোগীর চোখের সার্বিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে) লেসার বিম প্রয়োগ করা হয়।

ল্যাসিক কি একবারে চোখ ঠিক করতে পারে?
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ল্যাসিক করলে চোখের দৃষ্টি ঠিক হয়। তবে কখনো কখনো দ্বিতীয়বার ল্যাসিক করানোর প্রয়োজন পড়তে পারে। এটিকে বলে ল্যাসিক রিট্রিটমেন্ট। দেখা গেছে, ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রেই ল্যাসিক পরবর্তী সময়ে চোখের দৃষ্টি ২০/২০ থেকে ২০/৪০ এর মধ্যে হয়েছে। স্বাভাবিক কাজকর্ম করার জন্য এই দৃষ্টি যথেষ্ট বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে ল্যাসিক করার পরও আরো ভালো দেখতে চশমার সাহায্য প্রয়োজন হতে পারে। আবার ল্যাসিকের মাধ্যমে চোখের দৃষ্টিঘটিত সব সমস্যার চিকিৎসাও করা যায় না। যেমন প্রেসবায়োপিয়া। সাধারণত বয়সজনিত চোখের ক্ষতিটি এই নামে পরিচিত।

ল্যাসিক ও কন্টাক্ট লেন্স
দীর্ঘদিন চশমার বিকল্প হিসেবে কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহূত হয়ে আসছে। কিন্তু কন্টাক্ট লেন্স রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, তা অনেক কঠিন, বহু মানুষের পক্ষেই তা মেনে চলা কষ্টকর। যার কারণে মারাত্মক জটিলতা নিয়ে অনেক রোগীকে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়। অনেক সময় কন্টাক্ট লেন্স খুলে অথবা পড়ে হারিয়ে যেতে পারে। কন্টাক্ট লেন্স যে পদার্থ দিয়েই তৈরি হোক, এটা যেহেতু সরাসরি চোখের কর্নিয়ার ওপর বসানো থাকে, তাই সামান্য অসতর্কতায় কর্নিয়ার প্রদাহ, আলসার বা অন্য কোনো জটিলতা হতে পারে।

ল্যাসিকের সুবিধা
কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া বা সেলাই ছাড়া শুধু লেজার রশ্মি প্রয়োগ করে নিখুঁতভাবে চোখের পাওয়ার সংশোধন করা হয়। এ পদ্ধতি সর্বাধুনিক কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত, তাই নিখুঁত ও নিরাপদ বলে চিকিৎসকরা বিবেচনা করেন। মাত্র ১৫-২০ মিনিট সময়ের মধ্যে সার্বিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি থাকারও প্রয়োজন নেই। অপারেশনের পরে কোনো ব্যান্ডেজ লাগানো হয় না। বাসায় গিয়ে ৩-৪ ঘণ্টা বিশ্রাম করতে হয়। অপারেশনের পরের দিন থেকেই স্বাভাবিক চলাফেরা করা যায়। তিন থেকে চার দিন পর কর্মস্থলে যোগদান করা যায়।
তবে দুই সপ্তাহ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হয় এবং চোখের ডাক্তারের পরামর্শে কিছুদিন ওষুধ ব্যবহার করতে হয়।

যাঁরা ল্যাসিক করাতে পারবেন
সাধারণত আঠারো বছরের ঊর্ধ্বে যেকোনো বয়সে ল্যাসিক করা যায়। ল্যাসিক করার আগে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রি-ল্যাসিক বা ল্যাসিক পূর্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কর্নিয়া, রেটিনা, রিফ্যাকশন, চোখের প্রেশার পরীক্ষা ইত্যাদি। এসব পরীক্ষার পর চিকিৎসক যদি মনে করেন আপনার ল্যাসিক করা যাবে, তবেই ল্যাসিক করানো যাবে।
সাধারণভাবে যাঁদের চশমার পাওয়ার খুব দ্রুত পরিবর্তন করতে হয় না, যাঁদের চোখে সাধারণ দৃষ্টিজনিত সমস্যা ছাড়া অন্য কোনো জটিল সমস্যা থাকে না, তাঁরা ল্যাসিক করতে পারেন বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে শখের বশে নয়, শুধু চিকিৎসক যখন প্রয়োজন মনে করবেন তখনই ল্যাসিক করুন।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
যেকোনো সার্জারি বা অপারেশনের মতোই ল্যাসিকেরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। যদিও এটি কম্পিউটার যন্ত্রপাতি ও সর্বাধুনিক মেশিনে করার কারণে বিশেষজ্ঞরা নিরাপদ বলেই মনে করেন। তার পরও যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা দশমিক দুই ভাগ থেকে দুই ভাগ মানুষ ল্যাসিক করানোর পর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে। তবে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব ভয়ংকর কিছু নয়। চোখ কয়েক দিন লাল থাকা, পানি পড়া, শুষ্ক ভাব ইত্যাদি সাধারণ কিছু সমস্যা। তবে সবার ক্ষেত্রে এগুলো হয় না, আর হলেও তা নিরাময়যোগ্য। আরেকটি কথা, ল্যাসিক করানোর পর চোখের দৃষ্টি অ্যাডজাস্ট হতে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

বাংলাদেশে ল্যাসিক
এই অত্যাধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা এখন বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যাচ্ছে। যাঁরা চশমার সীমাবদ্ধতার কারণে বেশ কিছু বিশেষায়িত পেশায় অযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন তাঁরাও ল্যাসিক করে সেসব পেশায় নিজেকে যুক্ত করতে পারেন। তা ছাড়া বাংলাদেশে ল্যাসিক চিকিৎসার তুলনামূলক খরচও কম। এখানে ল্যাসিক করতে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মতো খরচ পড়ে, যা অন্যান্য দেশে অনেক বেশি।

সূত্র : ডাক্তার আছেন, কালের কণ্ঠ

Share and Enjoy !

0Shares
0 0

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*