প্রচ্ছদ > স্বাস্থ্য > শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় দুটি আইন
শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় দুটি আইন

শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় দুটি আইন

শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছর দুটি উল্লেখযোগ্য আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। একটি আইনে বলা হচ্ছে, মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য ও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা শিশুর বাড়তি খাদ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্য আরেকটি আইনে বলা হচ্ছে, ভোজ্যতেলে অবশ্যই ভিটামিন এ থাকতে হবে। পুষ্টিবিদেরা মনে করেন, ২০১৩ সালে এই দুটি আইন পাস দেশের শিশুদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

মাতৃদুগ্ধ ও শিশুখাদ্যবিষয়ক নতুন আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি দায়ী প্রতিষ্ঠানকেও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ অধ্যাপক এম কিউ-কে তালুকদার বলেন, ‘আইনটি শিশু পুষ্টির সহায়ক হয়েছে। এর সঠিক বাস্তবায়ন হলে শিশুকে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়বে। শিশুমৃত্যু কমবে। শিশুস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।’

তিনি বলেন, আইনটি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা দরকার এবং সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা দরকার। আগের ‘ব্রেস্ট-মিল্ক সাবস্টিটিউটি (রেগুলেশন অব মার্কেটিং) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪’ নামের আইনটি সংশোধন করে নতুন আইনটি তৈরি হয়েছে। এটি এখন ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশুখাদ্য, বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও উহা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ নামে অভিহিত হবে।

এই আইন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত সূত্র বলছে, আগের আইনের চেয়ে নতুন আইনটি অনেক বেশি শিশু স্বার্থের অনুকূল। আগের আইনে ‘শিশুখাদ্য’ ও ‘বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করা শিশুর বাড়তি খাদ্য’ সম্পর্কে কিছু বলা ছিল না। কিন্তু নতুন আইনে এ সম্পর্কে বলা আছে । মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য উৎপাদন ও বিতরণের সঙ্গে অনেক বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান জড়িত। অভিযোগ আছে, জরিমানার পরিমাণ কম ছিল বলে এরা বারবার একই অপরাধ করত। নতুন আইনে বলা হয়েছে, মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য বা বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করা শিশুর বাড়তি খাদ্য খেয়ে অথবা এগুলো ব্যবহারের সরঞ্জামাদির ব্যবহারের কারণে কোনো শিশু অসুস্থ হলে বা মৃত্যুবরণ করলে খাদ্য প্রস্তুতকারী বা সরঞ্জামাদি প্রস্তুতকারীর ১০ বছরের কারাদণ্ড হবে বা অনূর্ধ্ব ৫০ লাখ টাকা জরিমানা হবে অথবা উভয় দণ্ড হবে।

অভিযোগ আছে, খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা দেয়। পরিবর্তে শিশুর মা বা অভিভাবকদের নানা অজুহাতে তাদের পণ্য ব্যবহারের পরামর্শ দেন চিকিৎসক ও নার্সরা। নতুন আইনে বলা হয়েছে, ‘প্রস্তুতকারী কর্তৃক আয়োজিত বা তাহাদের সহায়তায় কোনো সেমিনার, কনফারেন্স, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ, বৈজ্ঞানিক সভা, শিক্ষাসফর বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানসহ উচ্চশিক্ষায় বা কোনো গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য কোনো ব্যক্তি বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা স্বাস্থ্যকর্মীকে আর্থিক বা অন্য কোনো সুবিধা প্রদান করা’ যাবে না।

সর্বশেষ জরিপ বলছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪১ শতাংশ শিশু খর্বকায়। অর্থাৎ এদের বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম। অন্যদিকে ৩৬ শতাংশ শিশুর বয়সের তুলনায় ওজন কম। পুষ্টিবিদেরা বলেন, শিশুকে শাল দুধ খাওয়ালে, জন্মের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ালে এবং ছয় মাসের পর থেকে ২৪ মাস পর্যন্ত যথাযথ পরিপূরক খাদ্যের পাশাপাশি মায়ের দুধ খাওয়ালে উচ্চতা ও ওজনের সমস্যা দূর হবে। কিন্তু শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর অন্যতম বাধা বাণিজ্যিক খাদ্য। এদের আগ্রাসী বিপণনব্যবস্থার তুলনায় মায়ের দুধের পক্ষে প্রচার-প্রচারণা খুবই দুর্বল।

জাতীয় পুষ্টিসেবার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক নাসরীন খান বলেন, ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ-সমৃদ্ধকরণ আইনটিও শিশু পুষ্টির সহায়ক। এ ব্যাপারেও মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। পুষ্টিবিদেরা বলেন, ভিটামিন এ-এর স্বল্পতার কারণে রাতকানা রোগ হয়। দেশের প্রথম জাতীয় অনুপুষ্টি উপাদান জরিপে বলা হচ্ছে, স্কুলের যাওয়ার বয়স হয়নি এমন শিশুদের ২০ শতাংশ এবং স্কুলগামী শিশুদের ২১ শতাংশ ভিটামিন এ-এর স্বল্পতায় ভুগছে।

ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ-সমৃদ্ধকরণ আইনটি ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয়। এই আইনে ভোজ্যতেলে ভিটামিন এ- সমৃদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ভিটামিন নেই, এমন ভোজ্যতেল আর বিদেশ থেকে আমদানি করা যাবে না। এখন থেকে তেলের বোতলে সমৃদ্ধকরণ ছাপ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আইনে ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল বিক্রি, সংরক্ষণ ও সরবরাহ না করলে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই অপরাধ আবার করলে দ্বিগুণ অর্থদণ্ড ও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

হোটেল , রেস্তোরাঁতেও ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ ভোজ্যতেল ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে এ আইনে। এ ছাড়া খুচরা ও পাইকারি ভোজ্যতেল বিক্রেতাকে এই আইনের অধীনে রাখা হয়েছে। কোনো খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা ভিটামিন এ-বিহীন ভোজ্যতেল বিক্রি করলে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

Share and Enjoy !

0Shares
0 0

Comments

comments

Comments are closed.