প্রচ্ছদ > স্বাস্থ্য > বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, > বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কোভিড-১৯ এর প্রভাব
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কোভিড-১৯ এর প্রভাব

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কোভিড-১৯ এর প্রভাব

এনকোভ-১৯, (nCov-19) মহামারীর ভাইরাসটি বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় মার্চ-২০২০। যদিও তার আগে অক্টোবর-২০১৯, (NOVEL CORONA VIRUS) সঙ্কেতে “এনকোভ-১৯, (nCov-19) বা সার্স-কোভ-২, (SARS-Cov-2)” নামক সদৃশ ভাইরাসের উৎপত্তি হয়, চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী, উহান শহরে। এরপর আস্তে আস্তে বীরদর্পে পৃথিবীর-২১৬ টি দেশে ভাইরাসটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি এনকোভ-১৯, ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে উন্নত দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলো আমাদের চেয়ে কঠিন সঙ্কট মোকাবেলা করছে। বিশ্ববিখ্যাত জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এর ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে পৃথিবীতে ১২ মিলিয়নের বেশি আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিত মৃত্যু বরণ করেছে প্রায় ৬ লাখ। এখানে একটি বিষয় প্রতীয়মান যে, উন্নত বিশ্ব, যারা অনেক গবেষণা বা আগাম ব্যবস্থা নেয়, তারাও প্রাথমিক পর্যায়ে ভাইরাসটির সংক্রমনের সক্ষমতা সম্পর্কে উদাসীনতা দেখিয়েছে, যার ফলে রোগটি একটি বৈশ্বিক মহামারীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর ভাষ্যমতে, এপ্রিল-২০২০ হতে আক্রান্ত এবং মৃত্যু দুটোই বাড়তে থাকে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯ শনাক্তের) সংক্রমণের তৃতীয় মাসে গিয়ে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়েছে। এই মাসে থেকে আক্রান্তের সংখ্যা, মৃত্যু, সংক্রমণ শনাক্তের হার—সবই দ্রুত বেড়েছে। আক্রান্তের শীর্ষ ২০ দেশে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এ সময়ে। গত সোমবার (১৩-০৭-২০২০) পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১,৮৬,৮৯৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন সর্বমোট ২,৩৯১ জন, সুস্থ হয়েছেন ৯৮,৩১৭ জন। এই সপ্তাহে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের আশেপাশে। পরীক্ষা বাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত ও হু হু করে বাড়ছে। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট তা হল, যে সকল দেশ স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয় সে সকল দেশই করোনা সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার চিত্রটি বোঝার জন্য শুধুমাত্র হাসপাতাল, চিকিৎসক, ঔষধ বা হাসপাতালের বেড ও রোগীর অনুপাত এর হিসাব দেওয়া যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে গড় আয়ু, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুহার এবং চিকিৎসা খরচ বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ১৭০মিলিয়নের বেশি মানুষের দেশে কতজন চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা তাদের মধ্যে কেমন সেটাও জানা জরুরী। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমাজের অনেক ব্যক্তি স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে অহেতুক সমালোচনা করে যাচ্ছে। যত দোষ নন্দ ঘোষের মত চিকিৎসকদের উপরে সব দোষ চাপানোর একটা অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা সহজেই ভুলে যাই এই প্রচলিত স্বাস্থ্য কর্মীরাই ইবোলা, নিপা, সোয়াইন ফ্লু, এমনকি গত বছরে সারা জাগানো ডেঙ্গুর মতো মহামারী ব্যাধিকেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারা সুনামের সাথে বাংলাদেশ সরকার, এদেশে আশ্রিত ১ মিলিয়নের বেশি রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কলেরা নির্মূলের লক্ষ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে প্রায় ২ মিলিয়ন টিকা প্রদানের মধ্য দিয়ে আমাদের ইপিআই এর সক্ষমতা বহুলাংশে প্রমাণ করে চলেছে। বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যার মূলে রয়েছে এই প্রচলিত স্বাস্থ্য কর্মীদের মাঠ পর্যায়ের সাফল্য, যা স্বাস্থ্যখাতকে এই বড় অর্জনের দিকে নিয়ে গিয়েছে।


বর্তমান সরকারের আমলে গত দশকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যাবিদ এবং বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, বাল্য বিবাহের প্রবণতা কমে যাওয়া, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে অগ্রগতি, তথাপি বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসা সেবার কারণে, বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিকন্তু ব্যবহারের মানের উপরে যে র‌্যাঙ্কিং করে, তাতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮ তম, যা মাঠ পর্যায়ে বর্তমানে স্বাস্থ্য কর্মীদের সফলতা কে ইঙ্গিত করে। সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের উপরে রয়েছে শুধু শ্রীলংকা ৭৬ তম। যে দেশে বাংলাদেশের কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাতে যান সেই ভারতের অবস্থান ১১২ তম, পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল এবং আফগানিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১২২, ১২8, ১8৭, ১৫০ এবং ১৭৩ তম। এই করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে উন্নত অনুন্নত দেশের মত আমাদের দেশেও ম্লান হতে চলেছে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সাফল্য।

বর্তমান সরকার শহরের স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে বিপুল গ্রামীণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে, যে সম্প্রসারণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তা কিন্তু এই প্রচলিত স্বাস্থ্যকর্মী দ্বারাই নিশ্চিত করা হচ্ছে। জাতির জনক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে “জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান” প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সময় ১৯৭৫ সালের ২৩শে এপ্রিল বাংলাদেশের জাতীয় পুষ্টি পরিষদ গঠনের আদেশে স্বাক্ষর করেন। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে “জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি” প্রণয়ন করেন এবং স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে প্রতি ৬ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য একটি করে মোট ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেন এবং প্রত্যন্ত গ্রামে প্রচলিত স্বাস্থ্যকর্মী দাঁড়াই সেই সেবা নিশ্চিত করানো হচ্ছে। এছাড়া রাজধানীসহ সারাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জেলায় জেলায় নতুন নতুন বিশেষায়িত ও জেনারেল হাসপাতাল স্থাপন যেমন, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্স, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি, দুটি হাসপাতাল মিলে ১,০০০ শয্যাবিশিষ্ট কুর্মিটোলা এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতাল, যেগুলোতে বর্তমানে কোভিড-১৯, রোগীদের চিকিৎসা চলছে, এছাড়া আরো ২০টি হাসপাতাল সম্প্রসারণ করা হচ্ছে উক্ত রোগীদের চিকিৎসার সেবার জন্য।


বর্তমান সরকার ২০১৬ সালে জাতীয় ঔষধ নীতি অনুমোদন করে, সেই আলোকে এই শিল্পের কাঁচামাল তৈরীর জন্য মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ২০০ একর জায়গায় এপিআই পার্ক নির্মাণ করা হয়। উন্নত অনুন্নত মিলে ৮৪ টি দেশে আমাদের তৈরি “মেড ইন বাংলাদেশ” ঔষধ রপ্তানি করা হচ্ছে। এসকল কার্যকরী সিদ্ধান্তের কারণে বর্তমানে সারাবিশ্ব প্রচলিত কোভিড-১৯, চিকিৎসার জন্য যে ধরনের ঔষধ প্রয়োগ করা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই আমাদের দেশে তৈরি হচ্ছে। সারা পৃথিবী যার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে তা হলো একটি কার্যকর ভ্যাকসিন, আর সেই ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে আমাদের দেশেরই একটি প্রতিষ্ঠান গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী সংগঠন ‘গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড। এই সাফল্য গুলো এসেছে মূলত ২০১৬ সালের ওষুধ নীতির কারণে। উন্নত বিশ্বের আদলে ২০৪টি মডেল ফার্মেসি এবং ১৮০টি মডেল মেডিকেল শপ চালু রয়েছে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সক্ষমতার উন্নতির দিক নির্দেশ করে।


জনসংখ্যার আধিক্য এবং সীমিত সম্পদ থাকার কারণে আমাদের দেশের পাবলিক হাসপাতাল গুলোর ডাক্তার এবং নার্সদের সংখ্যা অপ্রতুল। প্রতি ৩,০১২ জনের জন্য রেজিস্টার ডাক্তার মাত্র ১জন, সেই হিসেবে নার্স দরকার ২ লক্ষ ৮০ হাজার কিন্তু আছে মাত্র ২২ হাজার। প্রতি ২,৬৬৫জন রোগীর জন্য বেড আছে মাত্র ১টি। তেমনি রোগ নির্ণয়ের জন্য জনবল এবং যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকারি-বেসরকারি ডাক্তাররা শত কর্ম ঘন্টা ব্যয় করে প্রতিনিয়ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসা প্রদান করে চলেছে। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে সরকারি হাসপাতালে লম্বা লাইন এর ইঙ্গিত বহন করে।

আরো একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যের পেছনে মানুষ যত টাকা খরচ করে তার ৭৭ শতাংশ মানুষের নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান দন্ড হল ৩8 শতাংশ। তবে বিষয়টি অস্বীকার করা যাবে না, দিনদিন স্বাস্থ্যের ব্যয় সাধারণ মানুষের কাছে একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অর্থাৎ কেউ যদি দুরারোগ্য বা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিত্তবানরা হয় মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত হয় দরিদ্র অথচ এই চিকিৎসাসেবা বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও মৌলিক অধিকারের একটি। তবে আশার কথা হলো পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে চলিত এডিপিতে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে ৫৭ টি প্রকল্প চালু রয়েছে এবং সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় দুইটি বড় প্রকল্প পাস হয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য কর্মীদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন বীমা প্যাকেজ এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। একথা ভুলে গেলে হবে না গত এক দশকে আমাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সূচকে অনেকাংশে ঊর্ধ্বমুখী এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।


আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অন্যতম দুর্বলতার দিক হলো আমাদের বিদেশপ্রীতি। আমরা হরহামেশাই লক্ষ্য করি সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তরাও সুযোগ পেলেই চিকিৎসা করাতে বিদেশে দৌড়ান এবং এমনকি তারা বিদেশি সাবান, শ্যাম্পু, সিনেমা, ছুটি কাটাতে বিদেশ ভ্রমণ এবং সাথে একটু হোল বডি চেকআপ, এমনকি বিদেশি কোন ডাক্তার দেখলে কেমন যেন ইমোশনাল হয়ে ওঠে। বিদেশে ট্রিটমেন্ট করাতে পারলেই ধরে নেওয়া হয় তিনি সুচিকিৎসা পেয়েছেন এবং এই জনগোষ্ঠীর আরো ধারণা বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা শুধু প্রান্তিক এবং মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য। এগুলো দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের আস্থা, ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর।


চিকিৎসা সেবা নিয়ে সাধারণ অনেক মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার নয়, ঔষধ খাওয়ানো, খাবার সরবরাহ, বিছানা, এমনকি টয়লেট পরিষ্কার করার কাজ যে ডাক্তারদের নয় এটা বুঝতে অনেকেরই অসুবিধা হয়। টেস্ট দিলে অনেকের ধারণা ডাক্তার ব্যবসা করছে, রোগী এমনকি রোগীর আত্মীয় স্বজন হসপিটালে বেড বা স্থানের অভাবে ফ্লোরে ঘুমাচ্ছে এটাও ডাক্তারের দোষ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তো বটে অনেক শিক্ষিত মানুষ অসুখ হলে প্রথমে তারা ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজের কাছে দৌড়ান, পরে রোগীর অবস্থা যখন অবনতি হতে দেখে, তখন ডাক্তারের কাছে দৌড়ায়। এবং কোনো কারণে যদি রোগী মারা যায়, তাহলে আত্মীয়-স্বজন সবাই মিলে হাজির হয় ডাক্তার পেটানোর জন্য। কোন অবস্থাতেই যেন মৃত্যু কারো কাছেই কাম্য নয়, গত ১8 জুন খুলনা নগরে রাইসা ক্লিনিকে, শিউলি বেগম নামে এক প্রসূতি মা চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান, পরে ১৫ জুন রাতে শিউলি বেগমের স্বজনরা রাইসা ক্লিনিকের মালিক চিকিৎসক ডা. আব্দুর রাকিব খান কে পিটিয়ে হত্যা করেন। তবে এখন ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতি হয়েছে ভিন্ন, পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে অবস্থাতেই রোগী মারা যাক না কেন, আত্মীয়-স্বজনরা পালাচ্ছে লাশ রেখে, তবে আমার ধারণা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জনগণ আবার শক্তি সঞ্চয় করবে, ডাক্তার পেটানোর জন্য। আমার ধারণা এই ধরনের প্যারাডোক্সিকাল আচরণ আফ্রিকা এমনকি আমাজন রেইন ফরেস্টেও খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

স্বাস্থ্যকর্মীরা হাসপাতালে নিজের মৃত্যুর জন্য যাবে না, তারা আসলে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে জনগণের জীবন বাঁচাতে যাবে। আমরা সহজেই ভুলে গেছি, চীনে যখন এই মহামারী শুরু হয় তখন একজন ডাক্তারই সর্বপ্রথম সারা বিশ্বকে এই ভাইরাস সম্পর্কে জানিয়েছিল এবং পরে তিনি কিন্তু মারা যান। কোভিড-১৯ মহামারী বিশ্বজুড়ে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তাতে কিন্তু এখন পর্যন্ত দেবদূত হিসেবে একদম রোগীর সংস্পর্শে স্বাস্থ্যকর্মীরাই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এর ফলশ্রুতিতে ফ্রন্ট লাইনার হিসেবে যুদ্ধের ময়দানে ডাক্তার, প্রশাসনের লোক, আমাদের পুলিশ ভাইদের মৃত্যুর তালিকা দিন দিন লম্বা হচ্ছে। দেশে করোনায় চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের মধ্যে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭২৫ জন চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৫৫ জন। মৃত্যুহার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ হার জাতীয় হারের চেয়ে অনেক বেশি। দায়িত্বরত নার্স ও হাসপাতাল কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২,২৬১ জন। সব মিলিয়ে চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত দেশে মোট ৩,৩০১ জন করোনা সংক্রমণের শিকার। করোনা আক্রান্ত হয়ে প্রথমে মারা যায় চিকিৎসক ডা. মইনুদ্দিন এফসিপিএস, কার্ডিয়াক এমডি। এরপর ৩ মে, অধ্যাপক কর্নেল (অব 🙂 ডা. মো. মনিরুজ্জামান, ১১ই মে, অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান, ১২ ই মে, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের ডা. আবুল মোকারিম মো. মহসিন উদ্দিন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৮ই মে ডা. মোঃ আজিজুর রহমান রাজু, ডা. এম এ মতিন, ৪ জুন আমরা হারিয়েছি আরও ৫ জন চিকিৎসক কে। ৯ জুন মারা যায় ২ জন চিকিৎসক, ১২ জুন মারা যায় আরো ৩ জন চিকিৎসক। ১৭ জুন মারা যায় আরও ৪ জন চিকিৎসক, গত ১৫ এপ্রিল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা হারিয়েছি ৫৫ জনের বেশি চিকিৎসককে। এ বিষয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে, ‘চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী কেন আক্রান্ত হচ্ছেন, কেন মারা যাচ্ছেন, তার মূল্যায়ন হওয়া দরকার। পাশাপাশি সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে পেশাজীবী সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব অনেক।

করোনার শুরুতে সিলেট মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. মইনুদ্দিন কে আমরা হারিয়েছি এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জেনেছি, তিনি যখন শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন আমরা তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে বা ন্যূনতম আই সি ইউ সাপোর্ট সমৃদ্ধ এম্বুলেন্স দিয়ে ঢাকাতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করাতে ব্যর্থ হয়েছি। শিক্ষকতা প্রফেশনে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রায় অধিকাংশ ডাক্তার শিক্ষা জীবনের প্রতিটি স্তরে সর্বোচ্চ মেধার স্বাক্ষর রাখে। কিন্তু যখন ক্যাডার সার্ভিসে তারা প্রবেশ করে তখন অন্য ক্যাডারদের সাথে তাদের সুযোগ সুবিধার পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। স্বাস্থ্য খাতে সাসটেইনেবল উন্নয়ন করতে চাইলে রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই ধরনের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করতে হবে।


এইসময় ডাক্তারদের উৎসাহ দিতে হবে সমালোচনা নয়, মুশকিলের বিষয় হলো আমি আপনি ঘরে বসে সুশীল সেজে স্টে-হোম, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স, আইসোলেশন, প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন, হোম কোয়ারেন্টাইন ইত্যাদি নানান কিছু মুখরোচক কথা বলে যাচ্ছি, কিন্তু একজন ডাক্তার, একজন নার্স, একজন টেকনিশিয়ান, আমার আপনার, নিজের অথবা আত্মীয় স্বজনদের, জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তির লালা এবং রক্ত সংগ্রহ করে, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করছে এবং সেই পরীক্ষার রেজাল্টের ভিত্তিতে নিজের জীবন বাজি রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে। করোনাভাইরাস প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে এটা স্পষ্ট হতে থাকে, রোগীর অনুপাতে ডাক্তারদের আক্রান্ত হওয়ার এবং মৃত্যুহার বেশি, সাম্প্রতিককালে করোনায় চিকিৎসকদের মৃত্যুহার ৩ দশমিক ২ শতাংশ। আমরা মিডিয়াতে স্পষ্ট লক্ষ করেছি করোনাভাইরাস সংক্রমনের একদম শুরুর দিকে রাজধানীর টোলারবাগে দুই ডাক্তার আক্রান্ত, আমার নিকট বন্ধু ডা. মাসুদ সাভার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত অবস্থায় আক্রান্ত, মিটফোর্ড, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে অনেক ডাক্তার আক্রান্ত হয় মূলত তথ্য গোপন করে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, এই প্রমানের ভিত্তিতে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এই আতঙ্ক থেকে মূলত কোভিড-১৯ মহামারীর সেবা বিঘ্ন ঘটছে। মোটকথা স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ধরনের ঝুঁকি রাস না করানো পর্যন্ত, কোভিড-১৯ মহামারীর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। আমাদের এটা ভুলে গেলে হবে না, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে ডাক্তারদেরকে বলা হয় সুপার স্প্রেডার, অসুখ হলে মানুষ ডাক্তারের কাছে যাবে, ডাক্তারদের প্রপার সুরক্ষা না থাকলে তার সংস্পর্শে আসা বাকি রোগীরা, অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী, এমনকি তার পরিবার ও বিশাল ঝুঁকির মুখে পড়ে এটা আমরা সহজেই ভুলে যাচ্ছি। হাসপাতালে রোগী আসার স্রোত কমাতে না পারলে এই মহামারিতে আমাদের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এখানে মূলকথা (আইপিসি) ইনফরমেশন প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল কমানো না গেলে এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া কঠিন।


আমরা হরহামেশাই ভুলে যাই, স্বাস্থ্যকর্মীরাও মানুষ, তাদেরও প্রত্যেকের এক বা একাধিক স্টোমাক চালাতে হয়, তাদেরও ব্যাধিগ্রস্ত বাবা-মা, বা সুস্থ্য কিংবা অসুস্থ্য সন্তান থাকতে পারে, তাদের সন্তানও অপেক্ষা করে মা বাবা কখন বাড়িতে এসে দুধের বাচ্চাটিকে আদর করে জড়িয়ে ধরবে বা খাওয়ার ব্যবস্থা করবে, এই অবুঝ শিশুরা কিন্তু করোনাভাইরাস কি? তা বুঝে না। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসকের মার প্রোফাইল থেকে একটি হৃদয় স্পর্শী স্ট্যাটাস দেখলাম। সেই চিকিৎসক যখন কর্তব্যরত অবস্থায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্মিলিত সামরিক হসপিটালে ভর্তি, তখন তার মা লিখেছেন, আমার মেয়ের জন্য আপনারা দোয়া করবেন, তার দুটি অটিস্টিক ছেলেমেয়ে মা কখন আসবে তার জন্য প্রতিদিনের মতো দরজার সামনে অপেক্ষা করছে, এই শিশুরা করোনাভাইরাস কি তা বোঝেনা। সৃষ্টিকর্তা কাউকে ডাক্তার বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠান না, মানুষের মধ্যেই কেউ ডাক্তার হয়, সুতরাং মানবীয় দোষগুণ তার মধ্যে থাকতেই পারে, আধা পার্সেন্ট খারাপ করলে ৯৯.৯৫ শতাংশ কে ঢালাওভাবে খারাপ বলা কোনো যৌক্তিক আচরণ নয় বলে আমি মনে করি। সকল পেশাতেই ভালো খারাপ লোক আছে। আবেগের বশবর্তি হয়ে ডাক্তারদের সম্পর্কে বিষোদগার করা থেকে বিরত থাকুন, এইরকম আচরণ করতে থাকলে, আপনার যে সন্তানকে আপনি ডাক্তার বানাতে চাচ্ছেন, একদিন সেও কিন্তু এই বিষোদগারের শিকার হবে।


আমি আত্মীয়তার সূত্রে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর খুব কাছ থেকে করোনার সময়ে তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা এবং ব্যক্তিগত প্রটেকশন ব্যবস্থাপনা দেখেছি, এমনকি শখ করে একদিন পিপিই পড়ে অনুভব করেছি, পিপিই বিষয়টা কি! আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আমার সাথে অবশ্যই আপনারা একমত হবেন, পিপিই পরা অবস্থায়, আপনাকে দেখলে মনে হবে আপনি চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আমি হলফ করে বলতে পারি, পিপিই পরা অবস্থায় আপনি যদি সাইবেরিয়া বা আন্টার্টিকা ভ্রমণে বের হন, আপনি অবশ্যই শারীরিকভাবে উষ্ণ ফিল করবেন। আর সেই পিপিই পরে প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে দিনের বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকেনা সেই সকল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের হাজার হাজার স্বাস্থ্য কর্মী। আমি আরও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি, পিপিই পোশাক পরা অবস্থায় সাধারণ মানুষ দেখলে বিস্ময়কর আচরণ করে, দোকানদার পণ্য বিক্রি করতে চায় না, এমনকি অটো রিক্সা ওয়ালা কর্মস্থলে আনা-নেওয়া করতে প্রায় সময় অপারগতা প্রকাশ করে। সঠিকভাবে বলতে গেলে পেশাগত মানসিক চাপ সহ্য করে প্রতিনিয়ত সরকারি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান পরিস্থিতিতে হাজার-হাজার স্বাস্থ্যকর্মী। পদের সমালোচনা না করে খোঁজ নিন, স্বাস্থ্যকর্মীর বাড়িতে বাজারটা বা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে কিনা? কিন্তু বরাবরের মতো এবারও লক্ষ্য করছি বিভিন্ন দুর্যোগে সোশ্যাল মিডিয়ার পরিচিত মুখ, খাবারের বা ইফতারের প্যাকেট নিয়ে ছোটাছুটি করছে, সঙ্গে যুক্ত করেছে ফেইস মাস্ক পরিহিত ছবি! আমরা সহজেই ভুলে যাই, এই ডাক্তাররাই মেডিকেলে পড়ার সময় ১8 ঘণ্টার বেশি শিক্ষানবিশ অবস্থায় সাধারণ রোগীর সেবা করার পাশাপাশি, নিজেদের খাবারের টাকা বাচিয়ে গজ, ব্যান্ডেজ, ওষুধ কিনে দিয়েছে, রক্তের প্রয়োজন হলে নিজের শরীর থেকে রক্ত দিয়ে অনেক মুমূর্ষু রোগীদের কে বাঁচিয়েছে, আবার এখন নিজের শরীরের প্লাজমা দিয়ে কোভিড-১৯ রোগীদের বাঁচিয়ে চলেছে। আমরা সহজেই ভুলে গেছি, গতবছর ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন তুঙ্গে, তখন সারা বাংলাদেশে কর্মরত অবস্থায় ৯ জন ডাক্তার আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে । আইইডিসিআর এর ভাষ্যমতে, দেশে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সংক্রমণের প্রথম মাসে রোগী শনাক্ত হয় ২১৮ জন, যা এখন পর্যন্ত মোট রোগীর শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। দ্বিতীয় মাসে রোগী শনাক্ত হয় ১২ হাজার ৯১৬ জন, যা মোট আক্রান্তের ১৯ দশমিক ৬৩ শতাংশ। আর তৃতীয় মাসে আক্রান্ত হয়েছে মোট ৫২ হাজার ৬৩৫ জন, যা মোট আক্রান্তের শতকরা ৮০ ভাগ, গত রোববার (১২-০৭-২০২০) পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১,৮৬,৮৯৪ জন। প্রথম মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ২০ জন। দ্বিতীয় মাসে ১৮৬ জন। আর তৃতীয় মাসে মারা গেছেন ৬৮২ জন। মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৭ শতাংশ হয়েছে তৃতীয় মাসে। সংক্রমণ শনাক্তের চতুর্থ মাস পূর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার (১২-০৭-২০২০) মারা গেছেন সর্বমোট ২,৩৯১ জন, সুস্থ হয়েছেন ৯৮,৩১৭ জন। এই সপ্তাহে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ২৩-২৪ শতাংশের আশেপাশে। করোনা ভাইরাস কিন্তু আমাদের দেশের তৈরি ভাইরাস ছিলনা। বিশ্বব্যাপী এই রোগের কার্যকর কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো আবিষ্কার হয়নি। রোগের সংক্রমণ রোধ করার জন্য বিশ্বে এখন পর্যন্ত একটি মডেলই কার্যকর হিসেবে পরীক্ষিত: টেষ্ট (Test) – আক্রান্ত ব্যক্তির আইসোলেশন (Isolation)-আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা ব্যক্তির কোয়ারেন্টাইন (Contact Tracing and Quarantine) । করোনাভাইরাস যখন পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি বাংলাদেশে কাদেরকে ভিসা দেওয়া হবে এবং কাদেরকে দেওয়া হবে না। গত ১8ই মার্চ-২০২০ ইতালি ফেরত বাংলাদেশের প্রবাসী যে দলটি বিমানবন্দর দিয়ে ঢুকেছে, মূলত ধারণা করা হয় এদের দ্বারাই আমাদের দেশে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। অনেকে বলেছে ইতালি ফেরত এই দলটিকে যদি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করা যেত, তাহলে আজ আমাদের দেশের এই অবস্থা হতো না। এখানে ডাক্তারদের ওপরে চাপ প্রয়োগ করে ভাইরাস নির্মূল করা সম্ভব হবে না, মূলকথা (আইপিসি) ইনফরমেশন প্রিভেনশন এন্ড কন্ট্রোল কমানোর মধ্য দিয়ে একমাত্র যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব।

অসুস্থতা গোপন করা বাংলাদেশের মানুষের চিরায়িত একটি স্বভাব সে কারণেই বেশিরভাগ আক্রান্ত ব্যক্তি বাসা থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করছে। যদিও উন্নত দেশগুলোতে রোগী শনাক্তের পরীক্ষা, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (রোগীর সংস্পর্শে কারা এসেছিল) ও লকডাউন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ভালো। শঙ্কার বিষয় হলো বাংলাদেশের পরিস্থিতির বিশেষ করে অসুস্থতা গোপন এবং পরীক্ষা কম করা বিষয় দুটি যদি অব্যাহত থাকে তবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ আরো ঊর্ধ্বমুখী থাকবে বলে ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞরা মনে করছে। চলতি সপ্তাহের শেষ দিক থেকে এর ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। যেখানে গত সাত দিনে চীনে, শুধু উহান শহরে ৯৫ লক্ষ টেস্ট করা হয়, আর আমাদের দেশে দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টেস্ট করা হচ্ছে, ৭০টির মত “ট্রান্সক্রিপশন-পলিমেরাসে চেন রিঅ্যাকশন সংক্ষেপে (rRT-PCR)” মেশিন দিয়ে।


গত ৮ মার্চ ২০২০, দেশে প্রথম তিনজনের দেহে কোভিড-১৯ শনাক্তের কথা বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। তাঁদের দুজন ছিলেন ইতালিফেরত। অন্যজন আক্রান্ত এক ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন। এখন পর্যন্ত অন্তত ৮টি দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে দেশে এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুরুতে বিদেশফেরত ও তাঁদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণ সীমিত থাকলেও পরে সেটা ‘কমিউনিটি সংক্রমণের’ আকার ধারণ করে। সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কার্যত লকডাউন (অবরুদ্ধ) পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সেটা ছিল ঢিলেঢালা। এরপর ২৬ এপ্রিল ২০২০ থেকে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া হয়। এর দুই সপ্তাহ পর সংক্রমণের দশম সপ্তাহে (১০–১৬ মে- ২০২০) বা তৃতীয় মাসের শুরু থেকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে। সে ধারা এখনো অব্যাহত আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা এর মারফতে আমরা জানতে পারি বর্তমানে সংক্রমণ শনাক্তের হার ২০- ২8 শতাংশের আশপাশে। কিন্তু আমরা আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষ করেছি, লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ লকডাউন কে উপেক্ষা করে এই ঈদের ছুটিতে কিভাবে সারা দেশে যাতায়াত করেছে। সামনে কোরবানি ঈদে যদি একই ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে এই ব্যাপারে কেউ দ্বিমত পোষণ করবে না। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা আরও লক্ষ করেছি, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা করনা রোগীর বাড়িতে অপেক্ষা করছে, আর রোগী পালিয়ে বেড়াচ্ছে বা তাকে পাওয়া যাচ্ছে ঈদের শপিং রত অবস্থায়। মূলকথা ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি না করা পর্যন্ত এই ভাইরাস থেকে মুক্ত মেলা আসলেই কঠিন।


মোটকথা, এই লড়াইয়ে AK-47, আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পরমাণু সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ, ইসরাইলের বির্তকিত কাঁটাতারের বেড়া, F-16 যুদ্ধবিমান, ভারতের সিটিজেন আমেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট আইন, ইউরোপের অভিবাসন নীতি, কোন কিছু দিয়েই জয়ী হওয়া যাবে না। প্রয়োজন হবে স্বাস্থ্যকর্মী এবং সম্মুখ যোদ্ধাদের বাঁচিয়ে রাখা, উৎসাহ দেওয়া এবং নিজে সচেতন থাকা। এখানে একটি বিষয় প্রতীয়মান, করোনাভাইরাস মহামারী ঠেকাতে বা প্রস্তুতির বিচারে অনেক উন্নত দেশ পরাস্ত হয়েছে। আপনি ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ, আম্বানি, নরেন্দ্র মোদি, ইমরান খান বা টমক্রুজ হতে পারেন, কিন্তু এই অল্প সময়ে স্বাস্থ্যসেবা টিকে আয়ত্তে আনতে পারবেন না। আমার পরামর্শ হল, স্বাস্থ্যকর্মীদের কে বাঁচিয়ে রাখুন, উৎসাহ দিন, দুই একজনের ভুলের কারণে গণহারে সবাইকে সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন।

আরেকটি বিষয় বাংলাদেশ ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ দর্শনকে অনুসরণ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাজার ও ব্যক্তিকে উৎসাহিত করার নীতি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এ দেশে ধনাঢ্য, উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগণের জন্য ব্যয়বহুল হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার হিড়িক চলেছে চার দশক ধরে। সরকারি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বরাদ্দ কয়েক দশক ধরেই জিডিপির ১ শতাংশের কম। বর্তমানে যেহেতু প্রাইভেট সেক্টরে স্বাস্থ্য সেবা খাত অনেকটাই নির্ভর করে সুতরাং পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেসরকারী হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দানের সাথে সাথে, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সাথে অতি দ্রুত যুক্ত করতে হবে অথবা নীতিমালা গ্রহণ করে অতি দ্রুত এই সেবার সাথে যুক্ত করতে হবে। ধমক দিয়ে বাস্তবে আসলে কোন সমাধান হবে না।
আমরা অনেকেই এই ভাইরাসের ভয়াবহতা এবং সক্ষমতা এখন পর্যন্ত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি আর হসপিটালে গিয়ে ডাক্তারদের গালমন্দ করছি। আর এমন কিছু মানুষ যারা ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম কে নিয়মিত বিষোদগার করছে যা মোটেও কাম্য নয়। মার্ক্স্ এন্ড স্পেন্সর এবং বাংলাদেশের স্বপ্না ভৌমিক মহামারীর একদম শুরুর দিকে চার লক্ষ পিপিই বানানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছিল। আমি অবাক হলাম যাদের মার্কেটিং, ডিস্ট্রিবিউশন, সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এমন কি বিজনেস সম্পর্কে নূন্যতম ধারনা নাই, তারা অযাচিতভাবে স্বপ্না ভৌমিক সম্পর্কে অহেতুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করে যাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের একদম শুরুর দিকে আইইডিসিআর এর প্রধান মুখপাত্র মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা, যিনি কিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করা, তাকে ফেসবুকে তুলোধুনো করা হয়েছে। কেন? যারা তাকে হেনস্থা করে অমার্জিত বক্তব্যের বান ছুটিয়েছে তারা তাদের জীবনে কি ফেসবুকে একটা কুৎসিত স্ট্যাটাস দেওয়ার চাইতে বড় কোনও কাজ করেছে? করার ক্ষমতা আছে? বড় জানতে ইচ্ছা হয়। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পাবলিক পলিসি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয় কোন ধরনের নূন্যতম জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও, নির্দ্বিধায় স্বাস্থ্য খাতের বাজেট, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞের মত বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছে এবং সরকারকে বিষোদগার করছে। পক্ষান্তরে ট্যাক্সেবল ইনকাম থাকা সত্বেও ট্যাক্স দিচ্ছে না, অথবা উকিল ধরে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে, এটা ভাবেনা এই ট্যাক্সের টাকা দিয়ে সরকার আগামী বছর স্বাস্থ্য খাতে হয়তো আরো বেশি বাজেট মঞ্জুরী করতে পারে।


আমরা ভুলে গেছি সিরিয়ার সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা, মৃত্যুর পূর্বে যে বলেছিল আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেব। মনে হয় আসলেই সে বলে দিয়েছে আমাদের পৈশাচিকতা, হিংসা, লোভ, অসভ্যতা এবং নির্যাতনের কথা। ধর্মের নামে, ভাষার নামে, চামড়ার নামে আমরা পৃথিবী কে করেছি বিভক্ত । প্রকৃতিকে অবরুদ্ধ করে, আমরা শুরু করেছি হোলিখেলা। মনে হয় ঈশ্বর প্রকৃতি দিয়ে আমাদের বিচার শুরু করে দিয়েছেন, কার্যত সমাজবিরোধী সমস্ত কাজই আপাতত বন্ধ। বলতে গেলে গোটা বিশ্ব আজ খাঁচায় বন্দী, আর মুক্ত বাতাসে প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে তার আগের আপন মহিমা। আমি কাউকে হেয় বা ছোট করার জন্য এই লেখা টি লিখিনি, আমি আমার মেধা, প্রজ্ঞা এবং বিচার বুদ্ধি দিয়ে একটা বিষয়কে উপস্থাপন করার ন্যূনতম চেষ্টা করেছি মাত্র।


সবশেষে আমি বলব পৃথিবীর সব চিকিৎসকদের মাঠে নামার আগে ওয়ার্ল্ড মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন জেনেভা কনভেনশন এর গাইডলাইন অনুযায়ী একটা শপথ পড়ানো হয়। মূলত শপথের বাক্যগুলো এইরকম, আমি মানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করলাম, আমার রোগীর স্বাস্থ্য হবে আমার প্রথম বিবেচনা, রোগীর প্রতি দায়িত্ব পালনে কোনো অবস্থাতেই রোগ বা অক্ষমতা, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, জাতীয়তা, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধর্ম, যৌন দৃষ্টিভঙ্গি, লিঙ্গ, সামাজিক অবস্থান বা অন্য কোন বিষয় বিবেচনায় আনবো না। প্রিয় চিকিৎসক ভাই ও বোনেরা, আপনারা বিশ্বজুড়ে যা করে দেখাচ্ছেন আমি অনেক আগেই আপনাদেরকে সেলুট দিয়ে রেখেছি, এবার দয়া করে আপনাদের শপথ বাক্যটি সঠিকভাবে অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন, মারাত্মক রোগে আক্রান্ত অনেক রোগী অনেকদিন সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে সুতরাং সকল সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করুন, এটা আপনাদেরই দায়িত্ব। নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা সব দেখছেন এবং তিনি অবশ্যই আপনাদের সাথে আছেন।


আমার চূড়ান্ত মতামত হলো, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ মেনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়মিত সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে, পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোকে ও সমাজের অন্যদের নিরাপদ রাখার স্বার্থেই এগুলো করতেই হবে। ঘরে থাকুন, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, বিষোদগার কিংবা ঘৃণা-বিদ্বেষ না ছড়িয়ে বরং করোনা মোকাবেলায় যারা ফ্রন্টলাইনে আছেন তাদেরকে সমর্থন করুন, সহায়তা করুন। এছাড়াও করোনা প্রতিরোধে বাসার বাইরে বের হলে, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ভ্রমণের সময় এবং অধিক মানুষের সমাগম হলে সামাজিক দূরত্বের পাশাপাশি নিয়মানুযায়ী মাস্ক পড়ুন। জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা “ইউনিসেফ” এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যগত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে বছরে ৪২০ কোটি ডলার ক্ষতি হয়। অথচ নিয়মিত দিনে অন্তত পাঁচবার সঠিক নিয়মে হাত ধুয়ে এই ক্ষতির হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। সুতরাং করোনাভাইরাস চলে গেলেও এই স্বাস্থ্যবিধি গুলো মেনে চলুন। সর্বোপরি আপনার সুস্থতা আপনার কাছেই, তাই নিজে বাঁচুন, পরিবার ও প্রতিবেশীকে বাঁচান, পাশাপাশি এই বন্ধটাকে কাজে লাগান। আমি বিশ্বাস করি সুদিন আর বেশি দূরে নয়, করোনার বিরুদ্ধে মানুষের জয় হবেই ইনশাআল্লাহ, এই শুভ কামনায়, সবাইকে ধন্যবাদ।

আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
সহকারি অধ্যাপক, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
masud_ru_bd@yahoo.com

ডাঃ আইরিন ফেরদৌস
বিসিএস- স্বাস্থ্য, পিজিটি; সহকারী ডেন্টাল সার্জন
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চর ভদ্রাসন
ফরিদপুর, ৭৮০০।
aireeneva@yahoo.com

.

Share and Enjoy !

0Shares
0 0

Comments

comments

Comments are closed.